স্বেচ্ছায় তিন বছর ধরে ‘ট্রাফিক পুলিশ’ দীনহীন শফি

স্বেচ্ছায় তিন বছর ধরে ‘ট্রাফিক পুলিশ’ দীনহীন শফি
স্বেচ্ছায় তিন বছর ধরে ‘ট্রাফিক পুলিশ’ দীনহীন শফি। ছবি: আমার দেশ

গায়ে ট্রাফিক পুলিশের পোশাক। পায়ে জুতা। হাতের ইশারা দিয়ে থামাচ্ছেন যানবাহন। পথচারীদের পার করে দিচ্ছেন ব্যস্ত মহাসড়ক। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, দায়িত্ব পালন করছেন কোনো ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গায়ের পোশাক ও পায়ের জুতাগুলোও ধার করা। নেই সরকারি নিয়োগপত্র, বেতন-ভাতা কিংবা কোনো সুযোগ-সুবিধা। তবুও প্রায় তিন বছর ধরে স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল ইসলাম শফি। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সৈয়দপুর-রংপুর মহাসড়কের খিয়ার জুম্মা এলাকায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দেখা যায় শফিকে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চালকদের সতর্ক করা এবং পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পার হতে সহযোগিতা করেন তিনি। বিনিময়ে পান না একটি টাকাও। স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও খিয়ার জুম্মা এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। চোখের সামনে এসব দুর্ঘটনা ও মানুষের দুর্ভোগ দেখে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন শফি। একপর্যায়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে মহাসড়কে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

সেই থেকে প্রতিদিন সকাল হলেই মহাসড়কে চলে আসেন তিনি। যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে যাওয়া পথচারীদের সতর্ক করেন। শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদে পার হতে সহযোগিতা করেন। কখনো যানবাহন থামিয়ে মানুষকে পার হওয়ার সুযোগ করে দেন। শফিকুল ইসলাম শফি তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের খিয়ার জুম্মা বাজার এলাকার বাসিন্দা বাবা এছার উদ্দিন মাহমুদ। ছয় সন্তানের জনক শফি নিজেও অভাব-অনটনের সংসারে দিন কাটান।

বিজ্ঞাপন

সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। স্ত্রী-সন্তানদের চাহিদা পূরণ করাও কঠিন। সংসারের টানাপোড়েন নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্যও হয়। তারপরও মানুষের নিরাপত্তার জন্য প্রতিদিন দীর্ঘসময় মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। শফির দায়িত্ব পালনের পোশাকটিও তার নিজের নয়। এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে পোশাক ধার করেছেন। পায়ের জুতাও নিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে।

শফিকুল ইসলাম শফি আমার দেশকে বলেন, এই জায়গাত মোর চোখের সামনেই কত মানুষ এক্সিডেন্টে মরি গেইছে, কত রক্ত দেখছোম। তাই মাইনষের কথা ভাবিয়া তিন বছর ধরি এখানত ট্রাফিকের কাম করোম। মাইনষের জীবন বাঁচাইতে পারলে মোর খুব ভালো লাগে।

স্থানীয় পান দোকানদার রোস্তম বলেন, শফি নিয়মিত মহাসড়কে দাঁড়ানোর পর খিয়ার জুম্মা এলাকায় দুর্ঘটনা অনেকটাই কমেছে। তার উপস্থিতিতে চালকরা সতর্ক থাকেন। পথচারীরাও নিরাপদে সড়ক পার হওয়ার সুযোগ পান।

স্থানীয় দোকানদার মানিকুল বলেন, ‘নিজের সংসার চালাতেই যেখানে শফির কষ্ট হয়, সেখানে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করছেন।’

শফি জানেন, তিনি সরকারি ট্রাফিক পুলিশ নন। তার হাতে নেই কোনো সরকারি ক্ষমতা। নেই মাস শেষে বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা। এমনকি দায়িত্ব পালনের পোশাক ও জুতাগুলোও ধার করা। তারপরও মানুষের নিরাপত্তার জন্য মহাসড়ক থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মোস্তাফিজার বলেন, শফি আমাদের নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী নন। তবে শুনেছি, তিনি স্বেচ্ছায় খিয়ার জুম্মা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন