প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাটুরিয়ায় টার্মিনালের জমি দখল করে জমজমাট হয়ে উঠেছে বালু ব্যবসা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও এই পাটুরিয়া ঘাটে বন্ধ হচ্ছে না ফ্যাসিস্টদের বালু বাণিজ্য। বরং দাপটের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে বালু ব্যবসা। নদীর পাড়ঘেঁষে মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে পাটুরিয়া ঘাট। যেকোনো মুহূর্তে নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে এই ঘাট, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফেরি ও লঞ্চ ঘাট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা। অথচ তা প্রতিরোধে নেওয়া হচ্ছে না কোনো উদ্যোগ।
জানা গেছে, মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পাটুরিয়া ঘাটে বালু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দিনদিন বাড়ছে। এতে পাটুরিয়া ঘাটে যাওয়ার বিকল্প রাস্তাটিও ভেঙে পড়েছে। এসব রোধে প্রশাসনের তরফ হতে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। এদিকে ১৫ আগস্ট হঠাৎ ঘাট পরিদর্শনে আসেন বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান এটিএম আব্দুল বারী ড্যানি। ঘাট পরিদর্শনের পর বিআইডব্লিউটিসির ডিজিএম আব্দুস সালাম বলেন, স্যার চেয়ারম্যান হওয়ার পর আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাট রুটিন পরিদর্শন করেছেন। অন্য কিছু না। অথচ শিবালয়ের পাটুরিয়া ঘাটে বিআইডব্লিউএ’র ফোরসোর জায়গায় এবং নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে বালু-মাটি কাটায় মহোৎসব চলছে। রাতের আঁধারে পদ্মা নদীতে কাটার বসিয়ে বাল্কহেডে ফোরসোর জায়গা দখল করে বালু-মাটির ব্যবসা করছে স্থানীয় একটি দুর্বৃত্ত চক্র। সিন্ডিকেট করে স্থানীয় পোর্ট অফিসারকে ম্যানেজ করে এই বালু-মাটি কেটে দেদার বাণিজ্য করলেও সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। এভাবে অবৈধভাবে বালু-মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে, চলতি বর্ষা মৌসুমে পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও নৌবন্দরসহ আশপাশের এলাকা নদীভাঙনের কবলে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। একই কারণে পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও নদীবন্দর হুমকির মুখে পড়বে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে প্রভাবশালী নেতাদের যোগসাজশেই চলতো অবৈধ এসব বালু-মাটির ব্যবসা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও চলছে বালু-মাটির ব্যবসা। হাত বদলের নামে বর্তমান প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় আওয়ামী বালুচক্রের সদস্যরাই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটির ব্যবসা শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবৈধভাবে বালু-মাটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দেশের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিবালয়ের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে বালু ও মাটি ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে পাটুরিয়া ঘাট ও অন্যান্য এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাটুরিয়া ফেরিঘাটের আশপাশে বিআইডব্লিউটিএর ফোরসোর জায়গায় অন্তত পাঁচটি স্থানে অবৈধ বালুর চাতাল রয়েছে। নদীর তীরে এসব জায়গা থেকে বালু-মাটি কেটে নেওয়ার ধুম পড়েছে। সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল করে ভেকু মেশিনের সাহায্যে সারারাত নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে বালু-মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, অসাধু ব্যবসায়ীয়া সবাইকে ম্যানেজ করেই অবৈধভাবে বালু-মাটি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নদী ভাঙন শুরু হলে পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও নদীবন্দর এবং নদী তীরঘেঁষা গ্রামগুলো নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ী মিন্টু কাজী জানান, নদী এবং নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে বালু ও মাটি কাটা নিষেধ থাকলেও, তা কেউ মানছে না। অবৈধ বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পাটুরিয়াঘাটে বিআইডব্লিউটিএ’র ফোরসোর জায়গা দখল করে ৫টি অবৈধ বালুর চাতাল গড়ে উঠেছে। যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বালু-মাটি কেটে এনে নদীর পাড়ে রাখে। এখান থেকে ১০ চাকার ট্রাকে করে নিয়ে বিক্রি করছে।
এসব বিষয়ে কথা বললে শিবালয় মডেল ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, পাটুরিয়ায় অবৈধ ব্যবসা ওপেন সিক্রেট। দুর্বৃত্তরা বালু-মাটি কেটে তা বাজারজাত করার জন্য আমার ইউনিয়নের রাস্তাটি ব্যবহার করে ভেঙে ফেলেছে। এখন এই রাস্তা দিয়ে চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এবং সরকারি সম্পত্তিরও ক্ষতি হচ্ছে। এই বিষয়ে বারবার প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।
এ বিষয়ে আরিচা ও পাটুরিয়া নদীবন্দর কর্মকর্তা সুব্রত রায় বলেছেন, পাটুরিয়া ঘাটে তাদের ফোরসোর জায়গায় অবৈধভাবে বালুর চাতাল করে বালু-মাটি বিক্রি করছে একটি চক্র। এসব অবৈধ বালুর চাতালের তালিকা করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
একই ব্যাপারে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনীষা রানি কর্মকার জানান, পাটুরিয়াঘাটে অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমরা মাঝে মধ্যেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আসছি এবং আমাদের এই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

