পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া খনি

পাথর উত্তোলনে ফিরেছে গতি, বাড়ছে বিক্রি ও রাজস্ব

পাথর উত্তোলনে ফিরেছে গতি, বাড়ছে বিক্রি ও রাজস্ব
পাথর উত্তোলনে ফিরেছে গতি, বাড়ছে বিক্রি ও রাজস্ব । ছবি: আমার দেশ

দিনাজপুরের পার্বতীপুরের একমাত্র ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলাখনি মধ্যপাড়ায় দীর্ঘবিরতির পর পাথর উত্তোলনে আবার গতি ফিরেছে। বিস্ফোরক সংকটে ৫২ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার পর গত ১১ জুলাই থেকে পুনরায় পাথর উত্তোলন শুরু হয়েছে। এতে পাথর উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ায় রাজস্ব আয়ও বেড়েছে। তবে খনিটির দীর্ঘদিনের কয়েকটি সংকট এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে রয়েছে বিস্ফোরকের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, পাথর পরিবহনের উচ্চ ব্যয়, দীর্ঘদিন অচল থাকা রেলপথ এবং খনির পাথরের বাজার সম্প্রসারণ। এসব কারণে খনিটির অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের ১৯ মে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সংকটে মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। খনির ভূগর্ভে পাথর কাটার জন্য ব্যবহৃত বিস্ফোরকের সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৫২ দিন পর প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক সরবরাহ পাওয়ায় ১১ জুলাই থেকে আবার পাথর উত্তোলন শুরু হয়। বিস্ফোরক সরবরাহের সংকট অতীতেও খনিটির উৎপাদন ব্যাহত করেছে। ফলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

বর্তমানে মধ্যপাড়া খনিতে জিটিসির পাথর উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে পাথর বিক্রিও বেড়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। খনি থেকে উত্তোলিত পাথরের বড় অংশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে যাচ্ছে। জিটিসি প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন পাথর উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। খনির উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে দেশীয় পাথরের সরবরাহ আরো বাড়ানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিজ্ঞাপন

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া ছয় বছর মেয়াদি চুক্তিতে জিটিসির ১৪টি স্টোপ উন্নয়নের মাধ্যমে ৮৮ লাখ ৬০ হাজার টন পাথর উৎপাদনের কথা রয়েছে। অন্যদিকে আগের চুক্তির অধীনে ৯২ লাখ টন পাথর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল বলে জানা গেছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা, বাস্তব উৎপাদন এবং চুক্তির আর্থিক কাঠামো নিয়ে অতীতে নানা প্রশ্নও উঠেছে। এ কারণে খনির ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, চুক্তির শর্ত পূরণ এবং সরকারি স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উৎপাদন বাড়লেও বিক্রি কমে গেলে খনিতে বিপুল পরিমাণ পাথর জমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। চলতি বছরের মার্চে প্রায় ১৫ লাখ টন অবিক্রীত পাথর মজুত থাকার কথা বলা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পাথর বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই চাপ কিছুটা কমেছে বলে জানা গেছে। এখন উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থায়ী বাজার নিশ্চিত করাই বড় বিষয়।

মধ্যপাড়া খনির অন্যতম বড় সমস্যা পাথর পরিবহন। ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার রেলপথ দীর্ঘদিন অচল থাকায় খনির পাথর মূলত সড়কপথে পরিবহন করতে হচ্ছে। প্রায় ১৫ বছর বন্ধ থাকার পর ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। রেলপথটি পুনরায় চালু করা গেলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর পরিবহন করা সম্ভব হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মধ্যপাড়ার পাথর সরবরাহ আরো সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খনির ঠিকাদারি চুক্তির আর্থিক কাঠামোতেও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চুক্তির সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, পরবর্তীতে তা বেড়ে প্রায় ১২২ টাকায় পৌঁছায়। এতে ঠিকাদারের বিল পরিশোধে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয়েছে এবং খনির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে মধ্যপাড়া খনিতে উৎপাদন সচল এবং পাথর বিক্রি বাড়ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে খনিটিকে লাভজনক ও টেকসই রাখতে অন্তত তিনটি বিষয়ে দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিস্ফোরক অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাথরের বাজার নিশ্চিত করা এবং অবিক্রীত পাথরের মজুত কমানো। ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ দ্রুত সংস্কার করে পাথর পরিবহন পুনরায় রেলপথে চালু করা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন