জুলাই অভ্যুত্থানে বিজয়ের দিনে নিখোঁজ

শহীদ মুন্নার লাশের সন্ধান পেলেও এখনো মেলেনি গেজেট

শহীদ মুন্নার লাশের সন্ধান পেলেও এখনো মেলেনি গেজেট
শহীদ সাব্বির হোসেন মুন্না। ছবি: আমার দেশ

৫ আগস্ট, ২০২৪ কাউকে না বলে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়ে আর বাসায় ফিরেনি শহীদ সাব্বির হোসেন মুন্না। তার মাসহ পরিবারের লোকজন তাকে অনেক খুঁজতে থাকে আর অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে মুন্না আসছে। কিন্তু ছেলে আর বাড়িতে ফিরে না। অবশেষে ১৬ মাস পর মা তার ছেলের সন্ধান পায় ঠিকই, কিন্তু জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে জুরাইন গণকবর স্থানে দাফন করা হয়। ডিএনএ টেস্টে তারা নিশ্চিত হয়, শহিদ মুন্না গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে জুরাইন গণকবর স্থানে দাফন করা হয়েছে।

পরে শাহবাগ থানার একটি চিরিকুট লেখা নিয়ে জুরাইন কবর স্থানে গিয়ে কবর নিশ্চিত হয় পরিবার। মুন্নার লাশের সন্ধান পেলেও জুলাই যোদ্ধার শহীদের গেজেটে শহীদ সাব্বির হোসেন মুন্নার নাম না ওঠায় আক্ষেপ রয়ে গেছে পরিবারের । দ্রুত সময়ে ভাইয়ের নামে গেজেটে প্রকাশ ও তার লাশ কিশোরগঞ্জে আনতে চাই- এটি আমাদের পরিবারের দাবি।

বিজ্ঞাপন

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের আলোচনা সভায় শহীদ সাব্বির হোসেন মুন্নার একমাত্র বোন সুমাইয়া আক্তার কাঁদতে কাঁদতে এ কথাগুলো বলেন।

শহীদ সাব্বির হোসেন মুন্নার গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার উত্তর দুরাকুটি গ্রামে। তারা এক ভাই এক বোন। ১৫ বছর ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে থাকেন। মুন্না ১৫ পারা কোরআনের হাফেজ। পরিবারের অভাবের কারণে মা-বাবার সঙ্গে গার্মেন্সে করতেন। তার জন্য বিয়ের পাত্রীও খোঁজা হচ্ছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪ সে স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।

সুমাইয়া আক্তার অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ৪ আগস্ট রাতে ভাইয়া আমাকে বলে, জানিস আন্দোলনে তার পেছনে থাকা একজনের মাথায় গুলি লেগে গুলি বের হয়ে গিয়েছে। পরের দিন ভাইয়া সকালে গোপনে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। সেই বিজয়ের চূড়ান্ত দিন থেকে ভাইয়াকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর আমার ভাইয়ের খোঁজে মা ঘুরেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ, সোনারগাঁও থানা, শাহবাগ থানা, মালিবাগ সিআইডি অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে। থানায় নিখোঁজে করা হয় জিডি। ভাইয়ের নিখোঁজের পর থেকে মা তাকে খুঁজতে খুঁজতে অসুস্থ হয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। অনেক জায়গায় খুঁজতে খুঁজতে শাহবাগ থানায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া বিকৃত একটি লাশের ছবি দেখে মা ভাইয়াকে চিনতে পারেন। ২০ নভেম্বর, ২০২৫ ছবির সূত্র ধরেই ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, অজ্ঞাতনামা মৃতদেহটি আমার ভাই সাব্বির হোসেন মুন্নার।

সুমাইয়া জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ৫ আগস্ট বিজয়ের দিনে লংমার্চে কাঁচপুর থেকে যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশের গুলিতে নিহত হন মুন্না। তখন থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংরক্ষিত ছিল বেওয়ারিশ ছয়টি লাশ। বেওয়ারিশ হিসেবে ওই ৬টি লাশ জুরাইন গণকবর স্থানে দাফন করা হয়, তার একটি আমার ভাইয়ের।

শাহবাগ থানা থেকে চিরকুটে লিখে দেয়া হয় রোড নং-১১, লাইন উত্তর (পশ্চিম ১০), কবর নং-২০, জুরাইন কবরস্থান। সে কবরটি আমার ভাই শহিদ মুন্নার। দীর্ঘ ১৬ মাস পর ডিএনএ টেস্টে নিশ্চিত হওয়ার পর নিখোঁজ ভাইকে ফিরে পাই কবর স্থানে।

তার লাশের সন্ধান পেয়েছি এটাই সান্তনা। তবে দুঃখ হলো, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে গেজেটে নামভুক্তির জন্য আবেদন করা হলে এখনও গেজেটে নাম ওঠেনি। কবে প্রক্রিয়া শেষ হবে প্রশ্ন আমার?

আমার ভাইয়ের লাশ আমরা গ্রামে আনতে চাই, শহীদ নাঈম বাবু ভাইকে যেভাবে শ্রদ্ধা করা হলো, আমার ভাইকেও সেভাবে শ্রদ্ধা করতে দেখব- এটাই পরম পাওয়া।

রাষ্ট্রের কাছে দাবি, ভাইয়ের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি। শহিদ মুন্নার মা মুক্তা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, দীর্ঘদিন পর ছেলেকে খুঁজে পেয়েছি, তবে কবর স্থানে। আমি আমার ছেলের শহীদ গেজেটে নাম ও রাষ্ট্রের কাছে তার আত্মত্যাগের স্বীকৃতি ছাড়া আর কি চাইতে পারি? আমার ছেলের নাম গেজেটে মন্ত্রণালয়ে কাজ চলছে, দ্রুত অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আশা করছি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুর রহমান বলেন, আমরা কাগজপত্রগুলো দেখে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আশু দৃষ্টি কামনা করব, যাতে দ্রুত গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন