আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হারাগাছে শৌচাগার সংকটে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে হাজারো মানুষ, ভোটের মাঠে সমালোচনা

উপজেলা প্রতিনিধি, পীরগাছা (রংপুর)

হারাগাছে শৌচাগার সংকটে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে হাজারো মানুষ, ভোটের মাঠে সমালোচনা

রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে। প্রার্থীদের বক্তব্যে উঠে আসছে এই এলাকার নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অর্জন ও বঞ্চনা, সুযোগ-সুবিধা ও জনদুর্ভোগের নানা চিত্র। এরই ধারাবাহিকতায় হারাগাছ পৌরসভার গফুরটারী কলোনীর ভয়াবহ স্যানিটেশন সংকট এখন নির্বাচনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি পীরগাছার কান্দিতে আয়োজিত এক উঠান বৈঠকে “ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ” জোটের প্রার্থী ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সাংবাদিক ও জনতার উদ্দেশ্যে গফুরটারী কলোনীর মানবেতর জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, “নামে পৌরসভা হলেও গফুরটারীতে প্রবেশ করলে মনে হবে আদিম যুগের কোনো বন্দিশালা। প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও এখানে ব্যবহারযোগ্য কোনো শৌচাগার নেই। ছয় দশক ধরে চলা এই অমানবিক অবস্থা এখন একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবন ও মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ গফুরটারীর মানুষ সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রতিদিন ভোরে শৌচাগারের সামনে দীর্ঘ লাইন হয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “গফুরটারীর মানুষের কি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নেই?”

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলোনীবাসীর কণ্ঠে শুধুই বেদনা আর ক্ষোভ। স্থানীয় বাসিন্দা সামিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের টিউবওয়েল নাই, গোসলখানা নাই। সকালে টয়লেটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কাপড়েই প্রস্রাব হয়ে যায়। আমরা কি মানুষ না?”

মমেনা বেগম জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় ময়লা পানি জমে থাকে সারাবছর। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন বিড়ি তৈরি করেও সংসার চলে না। ঈদ বা উৎসবে ভিজিএফ সুবিধাও নিয়মিত পান না বলে অভিযোগ তার।

মর্জিনা বেগম বলেন, “এখানে কেউ মারা গেলে জানাজার খাটলিও ঠিকমতো ঢোকানো যায় না। ৬০ বছরে কোনো মেয়র বা প্রশাসন আমাদের দিকে তাকায়নি।”

পরিবেশগত সংকটের প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনেও। ছকিনা বেগম বলেন, “এই দুর্গন্ধ আর নোংরা পরিবেশের কারণে অনেক মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যায়।” মুর্শিদা বেগম বলেন, “মেয়ে ডাক্তার বানালাম, কিন্তু পরিবেশের কারণে এখন বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে।”

মুশফিকুর রহমান জানান, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সারাবছরই থাকে।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের অপসারিত কাউন্সিলর মোশাররফ হোসেন বলেন, গফুর হাজী ভূমিহীনদের বসবাসের সুযোগ দিয়েছিলেন এবং কয়েকটি টয়লেট নির্মাণ করেছিলেন। তৃতীয় শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে কিছু সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাও তারা পেত।

মরহুম গফুর হাজীর ছেলে নাকিব হোসেন জানান, ১৯৬৫ সালে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তার বাবা এই কলোনি স্থাপন করেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এখন জায়গা সংকট তীব্র হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রংপুর জেলা জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা পঙ্কজ কুমার সাহা বলেন, “পৌরসভা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।”

হারাগাছ পৌর প্রশাসক (এসিল্যান্ড কাউনিয়া) অংকন পাল জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, “স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের অগ্রাধিকার। হারাগাছ পৌরসভার এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে স্থানীয় সরকার বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। বাজেটের মাধ্যমে আধুনিক স্যানিটেশন ও রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা দোরগোড়ায় হাজির হলেও ভোটের পর তাদের খোঁজ মেলে না—এই ক্ষোভ এখন গফুরটারী কলোনীবাসীর হতাশা ও প্রতিবাদে রূপ নিয়েছে। রংপুরের বিত্তশালী এলাকা হিসেবে পরিচিত হারাগাছের বুকে গফুরটারী বস্তির এই চিত্র উন্নয়নের দাবির সঙ্গে এক নির্মম বৈপরীত্য। অবিলম্বে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে এখানকার মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...