হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে কাবিটা, খাবিকা ও টিআর প্রকল্পে অস্বাভাবিক বরাদ্দ, কাজ না করে বিল উত্তোলন এবং একই প্রকল্পে একাধিকবার বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব প্রকল্প নিয়ে একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়ার টিআর, খাবিকা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের আউশকান্দি গ্রামের উলুকান্দি সড়কের সাবেক মেম্বার বরকত উল্লাহর বাড়ির পাশে খালের পানি চলাচলের জন্য একটি ছোট কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। কালভার্টটির প্রস্থ ৩ ফুট ও দৈর্ঘ্য ১৫ ফুট। এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ৮ নম্বর ওয়ার্ডে হলেও ওই ওয়ার্ডের কাউকে প্রকল্প কমিটিতে রাখা হয়নি। সভাপতি করা হয়েছে বেতাপুর গ্রামের শাহ আব্দুর রাজ্জাককে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বার সিজিল আহমদ সেজলু বলেন, আমরা এই কাজের খবর কিছুই জানি না। আমার ওয়ার্ডের কাউকে কাজে রাখা হয়নি।
আউশকান্দি ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শিহাব আহমদ বলেন, যে কাজ হয়েছে, সেখানে মনে হচ্ছে ২০-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমরা এই কাজের বিষয়ে কিছুই জানি না। শুনেছি, এমপি সাহেবের চাচা নাকি কাজ করছেন।
এদিকে, নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের মসিবপুর ফজলু মিয়ার বাড়ি থেকে নুরগাঁও জামাল মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত সড়ক সংস্কার প্রকল্প দেখিয়ে ৩ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এ প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে এমদাদুল হককে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওই স্থানে বাস্তবে কোনো সড়ক নেই। শেরখাই নদীর একটি বাঁধকে সড়ক দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে সড়ক পাকাকরণের কোনো চিহ্নও দেখা যায়নি।
প্রকল্প সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. ছালিক মিয়া বলেন, আমার ইউনিয়নে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, বিষয়টি আমাকে অবগত করা হয়নি। সম্পূর্ণ ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এখানে বাস্তবে কোনো সড়ক নেই।
অন্যদিকে, আউশকান্দি ইউনিয়নের আমুকোনা জামে মসজিদের সড়ক দেখিয়ে একই প্রকল্পে ১২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়ার চাচা শাহ আজাদ আলী সুমনের বাড়ির সামনে ওই সড়কের জন্য ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে এলাকায় নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে শাহ আজাদ আলী সুমন বলেন, তিনি কোনো প্রকল্পের সভাপতি না হলেও কাজ চলমান রয়েছে। কিছু প্রকল্পের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এ তিনটি প্রকল্পের পাশাপাশি সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়ার গ্রামের বাড়ি দেবপাড়া ইউনিয়নের জালালসাপ গ্রামের হযরত শাহ শাবুদ (রহ.) মাজার সড়কের একটি কাজে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই কাজে সড়কের পুরোনো ইট ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। ৩০০ ফুট কাজ করার কথা থাকলেও সরেজমিনে সর্বোচ্চ ২০০ ফুট কাজ হয়েছে বলে দেখা গেছে।
এসব বিষয়ে আউশকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ এবাদুর রহমান দারা বলেন, আমার ইউনিয়নের কাজগুলো এভাবে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে, অথচ আমি কিছুই জানি না। আমাদের মতামত নেওয়া হলে এভাবে হতো না।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিদুর রহমান বলেন, শাহ আজাদ আলী সুমন এমপি সাহেবের এসব বরাদ্দ আমাদের না জানিয়ে মনগড়াভাবে দিয়েছেন। তাই এখন এসব কাজের নয়ছয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। তারা দলের সুনাম নষ্ট করেছেন।
সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়ার মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এসব প্রকল্পের বিষয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের সহকারী হাবিবুর রহমান বলেন, কালভার্টের অর্ধেক, অর্থাৎ ১ লাখ টাকা, সরকারি কোষাগারে আজ (১৯ জুলাই) ফেরত দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল দীঘলবাকের প্রকল্পের কাজের টাকাও ফেরত দেওয়া হবে।
নবীগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাশেদুর রহমান বলেন, আমরা কিছু কাজ না দেখে শাহ আজাদ আলী সুমনের অনুরোধে বিল দিয়ে দিয়েছিলাম। এখন অভিযোগ আসায় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব। প্রকল্পগুলো এমপি মহোদয়ের প্রস্তাবে করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেন, আমরা এসব কাজের বিষয়ে অবগত হয়েছি। কিছু টাকা ফেরত এসেছে। বাকি কাজের বিষয়ে তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা সরেজমিনে এসব প্রকল্প পরিদর্শন করব।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

