প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশায় নির্মাণ করা হয়েছিল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। উদ্বোধনের সময় এলাকাবাসীর চোখে ছিল স্বস্তির স্বপ্ন—কাছেই মিলবে চিকিৎসা, ওষুধ ও মাতৃ-শিশুস্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই ধুলোয় মিশেছে।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বর্ণি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে উদ্বোধন করা হলেও ৫ বছর ৯ মাস পরও কার্যকরভাবে চালু হয়নি। জনবল সংকটে চিকিৎসাসেবা কার্যত বন্ধ। উদ্বোধনের পর হাতেগোনা কয়েক দিন ভবনটি খোলা হলেও অধিকাংশ সময়ই থাকে তালাবদ্ধ।
শুধু তালাই নয়—অযত্ন আর অব্যবস্থাপনায় সরকারি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ভবন ও আশপাশের পরিবেশও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
যে মাঠে রোগী ও স্বজনদের আনাগোনা থাকার কথা, সেখানে এখন অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল। ভবনের সামনে ও প্রবেশপথে জন্মেছে ঘাস-আগাছা। বিভিন্ন স্থানে জমেছে ময়লা-আবর্জনা। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের দেয়ালের রঙও বিবর্ণ হয়ে গেছে।
বড়লেখা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্ণি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে চারটি পদের মধ্যে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ও আয়া—এই দুটি পদের জনবল অনুমোদিত হয়েছে। অপর দুটি পদ—উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও এমএলএসএস—এখনও অনুমোদন করা হয়নি।
সম্প্রতি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নজরুল ইসলামকে বর্ণি ও নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তার সপ্তাহে দুই দিন বর্ণি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের কথা।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাস্তবে তিনি সপ্তাহে এক দিনের বেশি কেন্দ্রে আসেন না। কখনো কিছু সময় অবস্থান করে চলে যান, আবার কোনো কোনো সপ্তাহে তাকে দেখাই যায় না।
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রধান ফটক খোলা থাকলেও ভবনের মূল দরজায় ঝুলছে তালা। ভবনের সামনে ও প্রবেশপথের চারপাশে বেড়ে উঠেছে ঘাস-আগাছা। এখানে সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্ধারিত সীমানার ভেতরে অবাধে বিচরণ করছে গরু-ছাগল। মাঠের ঘাস খাচ্ছে গবাদিপশু। ভবনের দেয়ালের বিবর্ণ রঙ ও চারপাশের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে মনে হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এমন চিত্র দেখে প্রশ্ন উঠেছে—মানুষের চিকিৎসার জন্য নির্মিত এই ভবন কি শেষ পর্যন্ত গবাদিপশুর চারণভূমিতেই পরিণত হবে?
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জবলুর অভিযোগ, সপ্তাহে একদিন একজন স্বাস্থ্যকর্মী কেন্দ্রে আসেন। তিনি বলেন, সপ্তাহে এক দিন একজন আসেন। খুলেন, মানুষ আসলে বলেন ওষুধ নেই। এরপর আধা ঘণ্টা-৪০ মিনিট বসে চলে যান। আর কোনো খবর মেলে না। কোনো সপ্তাহে আসেন, কোনো সপ্তাহে আসেন না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চারপাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
জবলু বলেন, ‘ভবনটি উদ্বোধনের সময় আমরা খুশি হয়েছিলাম। প্রতিদিন ডাক্তার থাকার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ছয় বছর হলো, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কোনো কাজে আসছে না। আমাদের বর্ণিতে অনেক নেতা, কিন্তু কাজের কোনো নেতা নেই।’
কেন্দ্রটি কার্যকরভাবে চালু না থাকায় ইউনিয়নের মানুষ শুধু সাধারণ চিকিৎসা থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন না; হারাচ্ছেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি, প্রসবপূর্ব সেবা, প্রসবকালীন সেবা, নবজাতকের পরিচর্যা, শিশুস্বাস্থ্য সেবা, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা, সীমিত স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং সাধারণ রোগের চিকিৎসা—এসব সেবা পাওয়ার কথা ছিল এই কেন্দ্র থেকে।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কাছাকাছি একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু ভবন নির্মাণের পরও যদি সেখানে নিয়মিত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধ না থাকে, তাহলে অবকাঠামো থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা থেকে যায় অধরাই।
বড়লেখা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সীমা সিদ্দিকা বলেন, ‘বর্ণি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি নতুন। এখানে পদ সৃষ্টি হয়নি। ফলে মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছি। জনবল পাওয়া গেলে যথাযথভাবে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

