মৌলভীবাজারে এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম মেলেনি

মৌলভীবাজারে এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম মেলেনি

মৌলভীবাজার জেলায় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম এবারও পাওয়া যায়নি। অনেকেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চামড়া বিক্রির জন্য কোনো ক্রেতারই দেখা পাননি। এ কারণে বাধ্য হয়ে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন। অন্যদিকে শহরের কোরবানির চামড়া নামমাত্র মূল্যে ফড়িয়ারা কিনে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন। সরকার নির্ধারিত দাম থাকলেও তা মানছেন না আড়তদাররা। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে তাদের ‘পানির দামে’ চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র গুটিকয়েক আড়তদার সিন্ডিকেট গড়ে মৌলভীবাজার জেলার চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে চামড়ার প্রকৃত মূল্য না পেয়ে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সঠিক তদারকির অভাবে সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

সরকার প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও আড়তদাররা সেটি মানছেন না। ঈদের দিন শনিবার বিকালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, শত শত মৌসুমি ব্যবসায়ী ট্রাক, রিকশা ও অটোভ্যানে করে চামড়া নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আড়তদাররা ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকায় প্রতিটি গরুর চামড়া কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

গরুর চামড়া ৫০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া কেউ বিক্রিই করতে পারেননি।

এবারো চামড়ার বাজারে ধস নামায় বঞ্চিত হয়েছেন দুস্থরা। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

মৌলভীবাজার শহরের জামেয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের প্রিন্সিপাল মুফতি হাবিবুর রহমান বলেন, গত বছর আমাদের মাদ্রাসায় ৭০০ চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু ন্যায্য দাম পাইনি। এবারও কয়েকশ’ চামড়া সংগ্রহ করেছি, কিন্তু ন্যায্য দাম নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায়। চামড়া ব্যবসায়ীরা এবারও সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ পর্যন্ত প্রতি পিস বড় গরুর চামড়ার দর তারা আমাদের জানিয়েছেন। ক্রেতাদের মাঝে চামড়া কেনার কোনো আগ্রহ নেই। আমরা চামড়া ব্যবসায়ীদের বললাম সরকার যে দর নির্ধারণ করেছে আপনারা তো এর ধারেকাছেও নেই। তারা বলছেন, এসব ভুয়া। কাজেই এবারও আমরা চামড়া ন্যায্যমূল্যর বিক্রি করতে পারছি না।

শ্রীমঙ্গল শহরতলির রামনগর ছওতুল হেরা মাদ্রাসা থেকে শতাধিক চামড়া নিয়ে আসা মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মাদরাসার এতিম-গরিব ফান্ডের জন্য ৮০টি চামড়া নিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। কেউ গুরুত্বই দিচ্ছে না। দু-একজন চামড়া ব্যবসায়ী কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও গড়ে দাম বলছেন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। আর ছাগলের চামড়া কেউ কিনবেন না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন।

সিন্ডিকেটের কারণে এবারও পানির দরে চামড়া বিক্রি করতে তারা বাধ্য করছেন। সারা দিন ঘুরে ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করে এত অল্প দামে চামড়া বিক্রি করলে পিকআপের ভাড়াও উঠবে না। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গরিব দুস্থের হক নষ্টকারী ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান ওই শিক্ষক।

শহরের হাজী সোনা মিয়া সুরজান বিবি আলিয়া মাদ্রাসা ও বায়তুল আমান দারুল উলুম মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শাহিন আহমেদ বলেন, আমাদের মাদ্রাসায় এবার শতাধিক চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু গড়ে ৩০০ টাকা দরে প্রতি পিস চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। ভেবেছিলাম এবার সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দামে বিক্রি করে ন্যায্য মূল্য পাবো, কিন্তু সিন্ডিকেট থেকেই গেলো।

মৌলভীবাজার শহরের মুসলিম কোয়ার্টার এলাকার মুহিবুল ইসলাম জানান, তিনি এবার ১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় গরুর চামড়া ২০০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

কমলগঞ্জের শমসেরনগর এলাকার আব্দুস শহিদ বলেন, শমসেরনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা দরে চামড়া বিক্রির খবর শোনা গেছে। তিনি নিজেও তার কোরবানির পশুর চামড়া ২৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুস শহিদ বলেন, মৌলভীবাজার জেলায় বেশির ভাগ এলাকায় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল কলেজ রোড এলাকার আবুল হোসেন জানান, তিনি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকায় গরু দিয়ে কোরবানি দিয়েছেন। তার গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ২৫০ টাকায়।

উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের আঐ গ্রামের শিক্ষার নওরীন জাহান জ্যোতি জানান, তারা দুটি গরু কোরবানি দিয়েছেন। সারা দিনে কোনো ক্রেতা আসেনি চামড়া কিনতে।

শ্রীমঙ্গল শহরের চামড়া ব্যবসায়ী লায়েক মিয়া বলেন, তিন প্রায় সাত শতাধিক গরুর চামড়া কিনেছেন গড়ে ৫০ থেকে ২৫০ টাকা দরে। তার সব চামড়ায় শ্রমিক দিয়ে লবণ মাখতে হয়েছে। এতে পরিবহন খরচ ও শ্রমিকের পারিশ্রমিকের কারণে চামড়ার ক্রয়মূল্য বেড়ে যাবে।

শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের ভাড়াউড়া এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী খলিল মিয়া ও আরেক চামড়া ব্যবসায়ী রফিকুল মিয়া জানান, তারা স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকশ চামড়া কিনেছেন। প্রতি পিস চামড়া ৮০-২৫০ টাকা দরে কিনেছেন।

তারা বলেন, সংরক্ষণের জন্য লবণ ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতিটি চামড়ার দাম ৪০০-৫০০ পড়ে। তাই সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

জেলার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমরা যে দামে চামড়া কিনেছি এই দামে আড়তদারা কিনছেন না। আমরাও লোকসানে পড়েছি।

চামড়া বাজারের এই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

মৌলভীবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার মৌলভীবাজার জেলায় ৭০ হাজারের বেশি হাজার গবাদিপশু কোরবানি দেয়া হয়েছে। অথচ এই বিশাল চামড়া বাজারে কার্যকর কোনও মনিটরিং ছিল না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকেও তৎপরতা না থাকায় বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ঠেকানো যায়নি।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক আবুল হোসেন বলেন, ২০ বছর আগে যেই চামড়া হাজার টাকায় বিক্রি হতো, সেটা গত কয়েক বছর ১০০-২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবারও পানির দরে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। সরকার যদি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এমনটাই চলতে থাকবে।

এদিকে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের জন্য ঈদের চার দিন আগে মৌলভীবাজার জেলায় ১৭৭টি কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে ১২০ টন লবণ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলায় ১৭৭টি এতিমখানা ও কওমি মাদরাসায় লবণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৩টি, কমলগঞ্জ উপজেলায় ১৬টি, রাজনগর উপজেলায় ৩৯টি, কুলাউড়া উপজেলায় ৩৫টি, জুড়ী উপজেলায় ২২টি, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৩০টি ও বড়লেখা উপজেলায় ২২টি এতিমখানা, কওমি ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কয়টি মাদ্রাসা-এতিমখানায় চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে?

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক বলেন, কোরবানির পশুর চামড়ার সিন্ডিকেট ভাঙতে মাঠে ম্যাজিস্ট্রেট , ইউএনও, সেনাবাহিনী তৎপর ছিল। অনিয়ম দৃষ্টিগোচর হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন