সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় এসেছে দুই মৃত ব্যক্তির নাম। তারা হলেন—বাহাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তারপুর গ্রামের রনু রঞ্জন সরকার। গত বছর তিনি মারা গেছেন। তার এক ছেলে পুলিশে ও আরেক ছেলে নার্সিংয়ে চাকরি করেন।
একই গ্রামের সুধীন চন্দ্র দাসও ছয় মাস আগে মারা গেছেন। তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় ঢুকিয়েছেন ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী।
ভান্ডাবিল হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক অজয় দাশ বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমনও লোক আছে, যাদের ১ কেদার জমি পানিতে তলিয়ে যায়নি, তাদের নামও তালিকায় রয়েছে। এই তালিকা কী করে হলো বুঝতে পারছি না।’
অভিযোগ উঠেছে, সরকারের তরফ থেকে সহায়তা পেলে ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরীকে অর্ধেক টাকা দেওয়ার শর্তে এসব মৃত ব্যক্তি ও অকৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচীব সমীর চন্দ্র সরকার ও ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরীর সিন্ডিকেটে এমনটা হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। শুধু তাই নয়, এই সিন্ডিকেট চক্রটি ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরীর নিজের নামও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মিহির চৌধুরী বলেন, ‘আমার নাম অন্যরা দিয়েছে। আমার বাবা আমার কাছ থেকে পৃথক। তিনি তিন মাস যাবৎ ঢাকায় আছেন, সেই সুবাদে আমার বাবার নাম লিস্টে দেওয়া হয়েছে। এক ব্যক্তির নাম দুই-তিনবারও এসেছে। কিছু মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকতে পারে। এগুলো সংশোধনের জন্য পরিষদে বলেছি। যারা বাদ পড়েছে, তাদের নতুন করে ঢোকানোর জন্য কৃষি কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছি।’
শুধু তাই নয়, সবেমাত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বাহাড়া গ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথ রায়। উপজেলা সদরে রয়েছে তার চারতলাবিশিষ্ট বাড়িও। অথচ তাকে ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মধুসূদন দাশ।
বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের সদস্য দেবব্রত তালুকদারের চাকরিজীবী ভাই-বোন ও মা-বাবাসহ অন্তত ১০ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায়।
ছেলেমেয়ে উভয়েই সরকারি চাকরি করেন বাহাড়া গ্রামের রামকৃষ্ণ রায়কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই তালিকায়। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে রৌওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আশীষ চৌধুরীকেও।
শাল্লা ইউনিয়নের সহাদেবপাশা গ্রামে চার বছর আগে মারা যান করফুল নেছা। তার নামও আছে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায়। এছাড়া একই গ্রামের আপ্তাব উদ্দিনের এক ছেলে ইউরোপে, আরেক ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকার পরও তার নাম উঠেছে তালিকায়।
উপজেলার মুক্তারপুর গ্রামের বাসিন্দা ছায়ার হাওরের কৃষক শিবেন্দ্র দাস বলেন, আট কেদার জমি করছিলাম। তিন কেদার কাটছি। বাকি পাঁচ কেদারই পানির নিচে গেছে। কিন্তু তালিকায় নেই তার নাম।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা একইভাবে নয়-ছয়ের তথ্য পাওয়া গেছে উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ইউপি সদস্য টিপু সুলতানের নিজের নাম।
উপজেলা কৃষক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক একরামুল হক বলেন, শাল্লা উপজেলায় অনেক মৃত ও ধনাঢ্য ব্যক্তির নাম তালিকায় রয়েছে। প্রকৃত কৃষক অনেকে বাদ পড়েছেন। দ্রুত তালিকা সংশোধনের দাবি জানান তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় বলেন, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, দুর্যোগ হলে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে কাজ করে পিআইও অফিস। অতএব, এ বিষয় আমার বক্তব্য না দেওয়াটাই সমীচীন হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খবর নিতে পারেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা না বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, শাল্লা উপজেলায় মৃত ব্যক্তি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হননি এমন ব্যক্তির নাম তালিকায় পাওয়া গেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

