ক্রমাগত বর্ষণে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে হাওরে। এতে দেখা দিয়েছে বন্যা। কৃষকরা পাকা বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
সুনামগঞ্জ থেকে জসীম উদ্দিন জানান, সুনামগঞ্জে ক্রমাগত ভারী বর্ষণে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে । এতে পাকা বোরোধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক । তাদের মনে পাকা ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে নষ্ট হবার আতঙ্ক বাড়ছে। এছাড়া্র ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে হতাশায় রয়েছেন কৃষকরা।
আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবার সুনামগঞ্জে বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে । কিন্তু সেই স্বপ্নের ফসল ঘরে তোলার আগেই কৃষকের সামনে দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ।অতিবৃষ্টিতে পাকা বোরোধান তলিয়ে যাবার শঙ্কায় ভোগছেন কৃষকরা। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, শ্রমিক সংকট, হারভেস্টার মেশিনের সীমাবদ্ধতা, ডিজেলের উচ্চমূল্য এবং নতুন করে যুক্ত হয়েছে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা। ফলে আনন্দের বদলে এখন হাওরজুড়ে বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা।
হাওর ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত সোনালি রঙে ছেয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কৃষক নির্বিঘ্নে ধান কাটতে পারলেও অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ধান কাটতে পারছেন না। জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন প্রবেশ করতে পারছে না। আবার শ্রমিকের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এদিকে যে পরিমাণ ধান কাটা হয়েছে, তা রোদের দেখা না মেলায় শুকাতে পারছেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, ‘এ বছর সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত হাওরে ৫৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। তবে জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকট রয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার আমার দেশকে জানান, ‘থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি আরো বাড়বে। আকস্মিক বন্যার শঙ্কা আছে। বৃষ্টিতে বাঁধ দুর্বল হয়ে গেছে। বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলের সেই চাপ বাঁধ সামলাতে পারবে না।’এবার পাউবো ফসল রক্ষার জন্য ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ৭০২টি প্রকল্পের ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে।
মধ্যনগর থেকে আতাউর রহমান জানান, সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সড়কের জামগড়া খালের বাঁধ ভেঙে ইয়ারন বিলে পানি প্রবেশ করছে। এতে হাওরে থাকা পাকা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে এ বাঁধটি ভেঙে পানি প্রবেশ শুরু হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ইকরাছইর হাওরের এরনবিল অংশে ৫০ হেক্টর এবং নন-হাওরে ৬৪ হেক্টরসহ মোট ১১৪ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে এরনবিল অংশের প্রায় ৪০ হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গেছে। বাকি ১০ হেক্টর জমি পানিতে আক্রান্ত হলেও সেগুলোও কেটে ঘরে আনার জন্য কৃষকরা হাওরে কাজ করছেন। এছাড়া হাওরে পানি প্রবেশ করলেও নন-হাওরের উঁচু জমি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ হাওরে এখনো প্রায় অর্ধেক জমির ধানকাটা বাকি রয়েছে। এমন সময় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় ফসল হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভাঙা বাঁধ দ্রুত মেরামতের মতো কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ভাঙা বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করলেও চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা উপজেলা কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা আকমল হোসেন জানান, পাহাড়ি ঢলে মনাই নদীতে পানি বাড়ায় চাপ সৃষ্টি হয়ে খালের বাঁধটি ভেঙে গেছে। এতে হাওরে পানি ঢুকছে। ভাঙা বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকায় এরনবিল অংশের ১০ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া উঁচু জমিতে পানি উঠার সম্ভাবনা তেমন নেই। যেসব জমির ধান পানিতে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলো দ্রুত কেটে ঘরে তুলতে কৃষকদের সঙ্গে মাঠে কাজ করছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

