২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার দিন হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলা ও গুলিতে শহীদ হন ৯ জন ছাত্র-জনতা। দুই বছরেও সেই ‘নাইন মার্ডার’ মামলার চার্জশিট আদালতে জমা পড়েনি। পুলিশ বলছে মামলা তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগুচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার এই মামলার বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
চব্বিশের জুলাই মাসে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট স্থানীয় এলআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জড়ো হয় ছাত্র-জনতা। দুপুরে বড়বাজার অভিমুখে মিছিল গেলে হামলা চালায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা।
পরদিন, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ ভেঙে দলে দলে রাস্তায় নামেন ছাত্র-জনতা। বড়বাজার শহীদ মিনারে গণমিছিল পৌঁছায়। পরে মিছিলের একটি অংশ থানা অভিমুখে অগ্রসর হলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডাররা গুলি চালায়। নিহত হন ১২ বছরের শিশু হোসাইন মিয়াসহ সাতজন। পরে হাসপাতালে মারা যান আরো দুইজন। যারা শহীদ হয়েছেন- তাদের মধ্যে বানিয়াচং উপজেলার ভাঙ্গারপাড়ের হোসাইন মিয়া, জাতুকর্ণপাড়ার আশরাফুল ইসলাম, তোফাজ্জল হোসেন, পাড়াগাঁওয়ের মোজাক্কির মিয়া, পূবগড়ের সাদিকুর রহমান, কামালখানীর শেখ নয়ন হোসেন, সাগরদিঘীর পূর্বপাড়ের সোহেল আখঞ্জী, চানপুরের আকিনুর রহমান ও খন্দকার মহল্লার ছেলে আনাস মিয়া।
এ হত্যাকাণ্ডের পর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বানিয়াচং থানা ঘেরাও করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার গণপিটুনিতে নিহত হন থানায় কর্মরত পুলিশের এসআই সন্তোষ চৌধুরী। পরবর্তীতে নিহত ৯ ছাত্র-জনতার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা, পুলিশের এসআই সন্তোষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি ও আহতদের পক্ষ থেকে চারটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় আসামি প্রায় ১০ হাজার। এখন পর্যন্ত একটি মামলার চার্জশীট দিতে পারেনি পুলিশ।
৯ জন শহীদ হওয়ার পর ২২ আগস্ট শহীদ হোসাইন মিয়ার বাবা ছানু মিয়া বাদী হয়ে ১৬০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক সাবেক এমপি ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েলকে। তিনি এখন পর্যন্ত পলাতক রয়েছেন। জনশ্রুতি আছে ইংল্যান্ডে অবস্থান করছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন ছয়বার। মামলার সাত নম্বর তদন্ত কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) কবির হোসেন বলেন, ‘আমি এই থানায় যোগদান করেছি ছয় মাস, উল্লেখিত মামলায় এ পর্যন্ত ৩০-৩৫ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। অন্যান্য আসামি গ্রেপ্তার ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে আমাদের অভিযান চলমান, তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে।’
শহীদ পরিবারের অভিযোগ, অনেক আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের ধরছে না। তদন্তে ধীরগতি দেখে ক্ষোভ জানান তারা।
মামলার বাদী শহীদ হোসাইন মিয়ার বাবা ছানু মিয়া বলেন, ‘মামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে জানতে চাইলে তারা কিছুই বলে না আমাকে। সন্তান হত্যার বিচার পাবো বলে মনে হয় না।’
শহীদ সাংবাদিক সুহেল আকঞ্জির স্ত্রী মৌসুমী আক্তার বলেন, ‘মামলার অগ্রগতির বিষয়ে কিছু জানি না, তবে শুনেছি এখনো মামলার চার্জশিটই হয়নি। তিনি বলেন, কবে স্বামী হত্যার বিচার পাব জানি না ।
শহীদ তোফাজ্জল হোসেনের বাবা আব্দুর রউফ মিয়া সন্তানের কথা স্মরণ করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘মামলা বিষয়ে কিছু জানি না।
বানিয়াচং থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ নাজমুল হক বলেন, আলোচিত নাইন মার্ডারসহ এই থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে। সবগুলো মামলা তদন্তাধীন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশি রিপোর্ট আদালতে প্রেরণ করা হবে।’
পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে যাচ্ছে, তাই বানিয়াচং থানায় ৯ হত্যা মামলাও যেতে পারে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

