দেশের কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় গতকাল সোমবার সকাল থেকে ভারত থেকে দেশে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। তবে এরই মধ্যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে এমন আইপিতে আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা যাবে।
আমদানিকারকরা বলছেন, আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে দেশের বাজারে আবারও বাড়তে পারে পেঁয়াজের দাম। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, দেশীয় নতুন পেঁয়াজ প্রচুর এসেছে বাজারে। ফলে এই মুহূর্তে আমদানি বন্ধ হলেও দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
এ বিষয়ে সোমবার রাতে হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সহ-সভাপতি মেসার্স রায়হান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শহীদুল ইসলাম শহীদ আমার দেশকে বলেন, ‘আমদানি অনুমতি বন্ধের ফলে সোমবার থেকেই পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আগের দিন যে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৬ থেকে ৫৩ টাকায়, সোমবার তা বিক্রি হয়েছে ৫৪ থেকে ৬২ টাকায়।’
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন আমার দেশকে বলেন, ‘আমদানি বন্ধের ফলে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যেতে পারে। কেননা, আজ দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হয়েছে। সোমবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ (নতুন) ৫৮ থেকে ৬০ টাকা আর পুরাতন ৬৩ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।’
কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের আমার দেশকে বলেন, ‘আগের দিনের তুলনায় দেশি পেঁয়াজের কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, নতুন পেঁয়াজ বাজারে এলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ আসেনি। তাই আমদানি বন্ধের ফলে দাম আবারও বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া আমদানিকারকরা কারসাজি করেও বাড়িয়ে দিতে পারে, এমনটি ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. জামাল উদ্দীন আমার দেশকে বলেন, ‘দেশীয় পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় সোমবার সকাল থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বিপুল পরিমাণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে এসেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা কারসাজি না করলে দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘৫১ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে ৮৬ হাজার টনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে আমদানি সম্পন্ন করলে আইপি বাতিল হয়ে যাবে।’
আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার সকাল থেকে নতুন করে ভারত থেকে দেশে কোনো পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়নি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। তবে পুরনো আমদানির অনুমতির বিপরীতে গতকাল হিলিসহ দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সোমবারও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ১২টি ট্রাকে ৩৪৪ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।
হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা বলেন, দেশে পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠলে দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়। এর ফলে ৩ মাস বন্ধের পর আবারও গত ৭ ডিসেম্বর থেকে হিলি স্থলবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। প্রথম দিকে আমদানির অনুমতির পরিমাণ কম ছিল। ফলে চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছিল না। পেঁয়াজের আমদানি কমের কারণে দেশের বাজরে দামে তেমন একটা প্রভাব পড়ছিল না। পরে আমদানির অনুমতি দেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে দেশের সব বন্দরগুলো দিয়ে আমদানি বাড়ার সাথে সাথে দাম কমতে শুরু করে।
বর্তমানে পেঁয়াজের দাম কমতে কমতে দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমে এসেছে। কিন্তু সোমবার সকাল থেকে সরকার আবারও পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সকাল থেকে আমদানির অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও কোনো আবেদন মঞ্জুর হয়নি। তবে এ সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন বা চিঠি ইস্যু করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবসাইয়ীরা জানতে পারেন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া সোমবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ে আবারও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
আমদানিকারক মোবারক হোসেন বলেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হওয়ার ফলে যে পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমে এসেছিল, তা আবারও বাড়তে শুরু করবে। ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতোমধ্যেই আমদানির অনুমতি দেওয়া বন্ধের খবরে বন্দরে কেজিতে ২ টাকার মতো বেড়েছে। মঙ্গলবার থেকে দাম আরো বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে দেশীয় পেঁয়াজের ওপর চাপ বাড়বে। সেক্ষেত্রে দেশীয় পেঁয়াজের দাম বাড়তে পারে। তাই দেশের বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানির অনুমতি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
হিলি স্থলবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপসহকারী সংগনিরোধ কর্মকর্তা ইউসুফ আলী বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলে বেশ কিছুদিন ধরেই বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। সোমবারও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। তবে এসব পেঁয়াজ পূর্বের আমদানির অনুমতির বিপরীতে আমদানি করা।’
তিনি বলেন, ‘সোমবার সকাল থেকে নতুন করে কোনো পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। তারা সোমবার থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি প্রদান বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে পূর্বের ইস্যুকৃত আমদানির অনুমতির বিপরীতে আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রাখতে পারবেন আমদানিকারকরা।’
এর আগে কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় পেয়াজ আমদানির অনুমতি বন্ধ রাখায় গত ৩০ আগস্ট থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ছিল। পরে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলে গত ৭ ডিসেম্বর থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


পেঁয়াজের উচ্চমূল্য রোধে আমদানির সিদ্ধান্ত
পেঁয়াজের কেজি ২০০ টাকা পার করানোর হুমকি দিয়েছিল সিন্ডিকেট
বিশেষ চক্র পেঁয়াজের বাজারে কারসাজি করেছে: কৃষি উপদেষ্টা