এনবিআরের চেয়ারম্যানকে অপসারণে আল্টিমেটামের নেপথ্যে

এনবিআরের চেয়ারম্যানকে অপসারণে আল্টিমেটামের নেপথ্যে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানকে অপসারণে আল্টিমেটাম ঘোষণা করেছে ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।’ আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে তাকে অপসারণে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ‘অসহযোগ’ কর্মসূচি পালন করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অপসারণ দাবির পর থেকে এনবিআর ভবনের কার্যালয়ে তিনি যাচ্ছেন না। তবে দাপ্তরিক প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে দায়িত্ব পালন করছেন। এনবিআর চেয়ারম্যান হলেও তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব পদে রয়েছেন।

তার পদত্যাগের বিষয়ে ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের’ দাবি, চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি তাদের আস্থা হারিয়েছেন এবং তার প্রতি তাদের কোনো বিশ্বাস নেই। গত সোমবার ঐক্য পরিষদ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করেন তারা। একইসঙ্গে তাকে ফ্যাসিবাদের দোসর ও বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ্য, আওয়ামী সু্বিধাভোগী আমলা হিসেবে বিগত হাসিনা সরকারের আমলে যারা এখনো প্রভাবশালী ভূমিকায় রয়েছেন, তাদের বিষয়ে আমার দেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে অন্যান্য আমলার মধ্যে আবদুর রহমান খানের নামও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অপসারণের বিষয়ে ঐক্য পরিষদের দাবিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সোমবার এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, এ ব্যাপারে আপনারাই দেখতে পারেন। আমার কোন বক্তব্য নেই।

এদিকে চেয়ারম্যান পদ থেকে আবদুর রহমান খানের অপসারণের বিষয়টি নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষে নানা ধরনের যুক্তি দিচ্ছেন তারা। তাদের কেউ মনে করছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যানের পক্ষে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। অপরদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, ওনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সে ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে একতরফাভাবে এক ধরনের প্রচারণা চালিয়ে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। এনবিআরের চেয়ারম্যান হওয়ার পর তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কারো কারো চক্ষুশূল হয়েছেন। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তার অপসারণে উঠে পড়ে লেগেছে একটি গ্রুপ।

চেয়ারম্যানের অপসারণে এনবিআর কর্মকর্তাদের দাবি ও অসহযোগ আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক সদস্য ও সরকারের সচিব ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের আন্দোলন কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এখন এগুলো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সচিবালয়ে যেভাবে আন্দোলন হচ্ছে-এগুলো কোনোটাই ঠিক নয়। সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণবিধি রয়েছে, সে অনুযায়ী তাদের আচরণ করা উচিত।

এদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের অপসারণ দাবির পেছনে শুধু অবিশ্বাস বা আস্থা হারানোর বিষয়টিই নয় আরো বেশকিছু কারণ রয়েছে বলে এনবিআরের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তারা বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছেন তিনি। আরো কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অপরদিকে ঢাকা যেসব কর্মকর্তা কখনো ঢাকার বাইরে বদলি হননি তাদেরকে তিনি বদলি করেছেন। ফলে ওই শ্রেণির কর্মকর্তারা তার অপসারণে সোচ্চার রয়েছেন।

অপরদিকে বর্তমানে চেয়ারম্যান অডিট কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। অডিট বন্ধ থাকার কারণে অসাধু কর্মকর্তারাও তার ওপর ক্ষুব্ধ। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, বিগত দিনে রাজস্ব কর্মকর্তারা ‘অডিটের’ ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ আদায় করতো। অডিট যাতে না হয় সেজন্য রাজস্ব কর্মকর্তাদের তারা ম্যানেজ করতো। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, অনলাইনে সিস্টেমে সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়কর রিটার্ন ইনপুট দেওয়ার পর অডিট কার্যক্রম শুরু হবে। সেক্ষেত্রে অডিটের আওতায় কে পড়বে সেটা আগে থেকে জানার যেমন সুযোগ থাকবে না তেমনি কোনো রাজস্ব কর্মকর্তার ইচ্ছায়ও তা থাকবে না। ফলে অডিটের ভয় দেখিয়ে অর্থ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে একশ্রেণির অসাধু কর কর্মকর্তা চেয়ারম্যানের প্রতি অসন্তুষ্ট। এছাড়া এনবিআরের সব কার্যক্রমকে অটোমেশনের আওতায় আনার জন্য কাজ করছেন বর্তমান চেয়ারম্যান।

অপরদিকে পতিত শেখ হাসিনার আমলে বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে করফাঁকি, অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়ম তদন্তে কাজ করছে এনবিআর। এ গোষ্ঠীটিও এনবিআর চেয়ার‌ম্যানকে সরানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। তাদের দাবি, বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীটি কোণঠাসা অবস্থায় থাকায় প্রকাশ্যে কোনো কিছু করতে পারছে না। কিন্তু নানাভাবে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবির পেছনে ওই গোষ্ঠীটির ইন্ধন থাকতে পারে বলে তাদের আশংকা।

এছাড়া চেয়ারম্যান এনবিআরের অটোমেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে অনলাইনে রিটার্ন বা ই-রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করেছেন তিনি। আগামী অর্থবছর থেকে এটি বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছেন তিনি। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অসাধু কর্মকর্তাদের বাড়তি আয়ের পথ বন্ধ হয়েছে এবং করদাতাদের হয়রানিও কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এখন ঘরে বসেই করদাতারা তাদের রিটার্ন জমা দিতে পারছেন। আগে রিটার্ন জমা দিতে সার্কেল অফিসে যেতে হতো। এতে করদাতাদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো এবং এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের পকেট ভারী করতো। কিন্তু এখন এ সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। এছাড়া ভ্যাট আদায়, আমদানি-রপ্তানিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমেও অনলাইন সিস্টেম চালু করেছেন বা করার উদ্যোগ নিয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান। এতে দুর্নীতি অনিয়ম রোধ করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক হয়রানিও কমে আসছে। কিন্তু অসাধু চক্রটি আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার কারণে এখন তার অপসারণে উঠে পড়ে লেগেছে।

তবে এনবিআর চেয়ারম্যানের এসব উদ্যোগ ও ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের একজন দায়িত্বশীল নেতা আমার দেশকে বলেন, চেয়ারম্যান আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, আমরা যেভাবেই চাই সেভাবে অধ্যাদেশ জারি হবে কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফলে আমাদেরকে আন্দোলন করতে হয়েছে। কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি রুটিন ওয়ার্ক বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঢাকা থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মকর্তাদের বদলির ধারা গত চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুমিনের আমলে শুরু হয়েছে। ই-রিটার্ন চালুর বিষয়ে ঐক্য পরিষদের এ নেতা বলেন, এটি বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের আওতায় অনলাইন সিস্টেম চালু হয়েছে। এটি আরও আগে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যে কোনো কারণে হোক এটা ওনার আমলে চালু হয়েছে কিন্তু এতে তার কোনো কৃতিত্ব নেই।

এখানে উল্লেখ্য, গত ১২ মে এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ জারির পর তা বাতিলসহ তিনদফা দাবিতে আন্দোলন করে আসছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে ২০ মে বৈঠকের পরদিন এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবি তোলে ঐক্য পরিষদ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন