কৃষক কার্ডের বিজ্ঞাপনচিত্রে আওয়ামীপন্থিদের উপস্থিতি

কৃষক কার্ডের বিজ্ঞাপনচিত্রে আওয়ামীপন্থিদের উপস্থিতি
খামারবাড়ি বঙ্গবন্ধু পরিষদের পক্ষে তৎকালীন আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা বনি আমিনকে ফুল দিচ্ছেন ফেরদৌস। ছবি: আমার দেশ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও প্রচার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)। মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তরগুলোর নীতি, প্রকল্প ও সরকারি সেবার তথ্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্ব। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানেই আওয়ামী লীগ আমলের রাজনৈতিক প্রভাব বলয় পুরোপুরি ভাঙেনি—এমন অভিযোগ ওঠেছে।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ‘কৃষক কার্ড’ নিয়ে নির্মিত টেলিভিশন বিজ্ঞাপনচিত্রে (টিভিসি) আওয়ামীপন্থি ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যুক্ত করার ঘটনায়।

বিজ্ঞাপন

এআইএসের নিজস্ব ওয়েবসাইটে কৃষক কার্ড নিয়ে নির্মিত টিভিসির তালিকায় ‘কৃষক কার্ডের সেবা: সহজ শর্তে কৃষি ঋণ’ শিরোনামের একটি বিজ্ঞাপনচিত্র রয়েছে। গত ২০ এপ্রিল সেটি এআইএসের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় একটি টিভিসি নির্মাণের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠার পর দ্বিতীয় টিভিসির শুটিং তালিকা থেকে

বঙ্গবন্ধু পরিষদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত একজনকে বাদ দিয়ে বাইরের শিল্পী ও কলাকুশলীদের মাধ্যমে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, প্রথম টিভিসিতে এআইএসের প্রেরক ফেরদৌস, স্টোরকিপার ইসরাত জাহান এবং ভিডিও এডিটর শাহ আলম অভিনয় করেন। সরকারি কর্মচারীদের কী প্রক্রিয়ায় টিভিসির জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল, এ বিষয়ে কোনো অফিস আদেশ ছিল কি না, কাজটি তাদের সরকারি দায়িত্বের অংশ কি না এবং কোনো সম্মানী দেওয়া হলে তার অর্থের উৎস কী—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

টিভিসিতে অভিনয় করা কয়েকজন কর্মচারীর অতীতে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্টোরকিপার ইসরাত জাহানকে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সক্রিয় সদস্য হিসেবে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিডিও এডিটর শাহ আলমের ছেলে আওয়ামী লীগ আমলে এআইএসের নির্মিত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করেছিলেন বলে জানা গেছে।

এআইএসের ফেরদৌস টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মাজারে ফুল দিয়েছেন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাসসহ খামারবাড়ি বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্যানেল থেকে যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন। তার ভাইয়ের নামে থাকা ‘আরএনজেড এন্টারপ্রাইজ’-এর ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে তিনি খামারবাড়িতে প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

টিভিসিতে অভিনয় করা স্টোরকিপার ইসরাত জাহান বলেন, কৃষক কার্ডের টিভিসিতে অভিনয় করতে হবে, তা তিনি আগে থেকে জানতেন না। উপপরিচালক (গণযোগাযোগ) ফেরদৌসী ইয়াসমিন তাকে প্রস্তাব দেন এবং এক ঘণ্টার নোটিসে তিনি অভিনয় করেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কখনো ফরম পূরণ করে সদস্য হয়েছিলেন কি না, তা তার মনে নেই।

ফিল্ম প্রোডাকশন অফিসার শাহনেওয়াজ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত সরকারি ডকুমেন্টারিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। স্টুডিওর কেনাকাটা ও সংস্কার কাজের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের সময় খামারবাড়ির সামনে আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসূচিতে তাকে ড্রোন চালাতে দেখা গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহনেওয়াজ আমার দেশকে বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর ডকুমেন্টারিতে ভয়েস দিলেও কৃষক কার্ডে তিনি ভয়েস দেননি।

বর্তমানে গণযোগাযোগ শাখায় ফিল্ম প্রোডাকশন অফিসার শাহনেওয়াজ, সহকারী ক্যামেরাম্যান মামুনুর রশিদ, ভিডিও এডিটর আল ইমরান ও প্রেরক ফেরদৌসকে নিয়ে নতুন একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সহকারী ক্যামেরাম্যান মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগ আমলে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের টাঙ্গাইলের বাড়িতে অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ ও ছবি প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা প্রভাবশালী ছিলেন, তাদেরই একটি অংশ বর্তমানে নিজেদের বিএনপি পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে গণযোগাযোগ শাখায় প্রভাব বিস্তার করছেন।

এআইএসের পরিচালক কৃষিবিদ মসীহুর রহমান এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে তিনি খামারবাড়িতে ছিলেন না। জুলাই বিপ্লবের পর তিনি এখানে যোগ দিয়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। প্রথম টিভিসিতে অভিনয়কারীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানার পর তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। দ্বিতীয় টিভিসি নিয়েও প্রশ্ন উঠলে পরিচালক বলেন, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানের পর বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে বাইরের শিল্পী ও কলাকুশলীদের দিয়ে টিভিসি নির্মাণ করা হচ্ছে।

এআইএসের উপপরিচালক (গণযোগাযোগ) ফেরদৌসী ইয়াসমিন আমার দেশকে এ বিষয়ে বলেন, ভাই, এই নিউজটি না করলেই হয় না। কে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য বা কে আওয়ামী লীগ করতেন—এসব তথ্য তার কাছে ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গণযোগাযোগ শাখায় দায়িত্ব পালন করা ফেরদৌসী ইয়াসমিনই কৃষক কার্ডের টিভিসিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ত করেছেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের দোসর বনি আমিন গ্রুপের সক্রিয় সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন গণযোগাযোগ শাখার এই ডিডি।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতো একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী আমলের সেটআপ এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বহাল থাকায় বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত দীর্ঘদিন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সুশাসন ফেরাতে অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’

কৃষি সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, কৃষক কার্ড বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার নির্বাচনি অঙ্গীকারের একটি। সেখানে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্যদের যুক্ত করে টিভিসি তৈরির ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। অভিযোগটি শুনলাম, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ‘কৃষক কার্ড’ সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গীকার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষিযন্ত্র, ভর্তুকি ও প্রণোদনা, আবহাওয়া ও বাজার তথ্য, প্রশিক্ষণ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষিবীমা এবং কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রয়সহ ১০ ধরনের সেবা দেওয়া হবে। গত ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলে কর্মসূচিটির প্রি-পাইলটিং উদ্বোধন করা হয়। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ফেনীতে দ্বিতীয় দফার উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন