বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটেও আমদানি, রপ্তানি ও রাজস্বে প্রবৃদ্ধি

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটেও আমদানি, রপ্তানি ও রাজস্বে প্রবৃদ্ধি
আমার দেশ গ্রাফিক্স

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ নানা অভিযোগে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। এই অজুহাতে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রণোদনাসহ নীতিগত সহায়তা আদায় করে নিতে চাপও দিচ্ছেন তারা। কিন্তু বন্দরের পণ্য আসা-যাওয়ার হিসাব, কাস্টমসের রাজস্ব আদায় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। আমদানি, রপ্তানি ও রাজস্ব আয় থেকে শুরু করে বিদেশি অর্ডারসহ জাতীয় অর্থনীতির প্রায় সবকটি সূচকেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে তেমন চিত্রই দেখা গেছে।

বিভিন্ন শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট আছে ঠিকই কিন্তু সেটি যেভাবে প্রচার করা

বিজ্ঞাপন

হচ্ছে, ততটা না। দিনের পিক আওয়ারে গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকলেও রাতে অফ পিক আওয়ারে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকে। ফলে গ্যাসনির্ভর অনেক কারখানা দিনে উৎপাদন কমিয়ে বা বন্ধ রেখে রাতে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে। এভাবে সংকট মোকাবিলা করে কৌশলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য।

এককভাবে দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৮ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭,৪২৯ কোটি টাকা, আগস্টে ৫,৪৮৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে আদায় কিছুটা কমে ৬,৯২৫ কোটি টাকা হলেও আগস্টে রেকর্ড ৭,০৯২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ফলে জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ে ৬.৭৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও আগস্টে ২৯.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, মূলত আমদানি বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করেই কাস্টমসের রাজস্ব আদায় হয়।

অর্থবছরের প্রথম মাসে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় মাসে আমদানি বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধির সূচকও বটে। তৃতীয় মাসেও প্রবৃদ্ধির ধারা ভালো রয়েছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ আসা-যাওয়া, কনটেইনার ও খোলা পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার টিইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে পাঁচ লাখ ৮৪ হাজার টিইইউ। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৩৪ হাজার টিইইউ। একই সময়ে বন্দরের জলসীমায় জাহাজ এসেছে ৬৮৪টি, গত বছরের ৬৭৪টির তুলনায় ১০টি বেশি। তবে খোলা পণ্য হ্যান্ডলিং সামান্য কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে দুই কোটি ১৫ লাখ ৪৫ হাজার টন খোলা পণ্য হ্যান্ডলিং হলেও চলতি বছরের একই সময়ে হয়েছে দুই কোটি ১৪ লাখ ৫২ হাজার টন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সহজ করতে বন্দর সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রয়েছে। আমদানি-রপ্তানিকারকদের হয়রানি এড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সচেতন। কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসাবান্ধব কার্যক্রমের কারণে বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

৬৫ ক্যাটাগরির আমদানিপণ্যের সঙ্গে শতভাগ রপ্তানিপণ্য হ্যান্ডলিং করে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বা অফডক কর্তৃপক্ষ। অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সবকটি অফডক মিলে রপ্তানি পণ্যবোঝাই ৮১ হাজার ১৩৫টি কনটেইনার জাহাজীকরণ করেছিল। আর আমদানি পণ্যবোঝাই ২৫ হাজার ৬১৩টি কনটেইনার আমদানিকারকের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিল। আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি জাহাজীকরণ করেছিল ৮০ হাজার ৯৪০টি রপ্তানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার। একই সঙ্গে ৩২ হাজার ৬২৮টি আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বিকডা জাহাজীকরণ করে ৮৪ হাজার ৪৭৮টি রপ্তানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার। একই সঙ্গে ২৮ হাজার ৭১৩টি আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। চলতি বছরের আগস্টে ৭৯ হাজার ৯৪টি রপ্তানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার ও ২৬ হাজার ১৩২টি আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে অফডক কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে দুই মাসে রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪.০১ শতাংশ।

বিকডার সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার বলেন, গ্যাস সংকট শুরুর পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে হা-হুতাশ বেড়েছে। কিন্তু আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যানের সঙ্গে ওই চিত্র পুরোপুরি মেলে না। অর্ধেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে রপ্তানি ও আমদানিতেও বড় ধরনের পতন দেখা যেত। বাস্তবে তা হয়নি। তবে গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

এদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ থেকে ৭৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৭১৩ কোটি ছয় লাখ ৭০ হাজার ডলার। এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫.১২ শতাংশ।

তৈরি পোশাক খাতে সামনে আরো অর্ডার বাড়ার প্রত্যাশা করছেন উদ্যোক্তারা। বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে সামার, উইন্টার ও স্প্রিংÑএই তিন সিজনে পোশাকের চাহিদা থাকে। আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা স্প্রিং সিজনটি সবচেয়ে বড়। এ সময়ে ব্ল্যাক ফ্রাইডে, ক্রিসমাস ও নিউ ইয়ারের মতো বড় উৎসব থাকায় অর্ডারও বাড়ে। এ বছরও প্রতিদিন নতুন অর্ডার আসছে।

তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে কারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, শিফট পরিবর্তন ও ছুটি সমন্বয় করে উৎপাদন সচল রাখা হচ্ছে। কারখানাগুলো পুরোপুরি স্মুথভাবে চললে আরো বেশি অর্ডার নেওয়া সম্ভব হতো বলে জানান তিনি।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এসএম আবু তৈয়ব বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন কমেছে, কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। তারপরও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ ধরে রাখতে শিল্প মালিকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এতে অন্তত চারগুণ খরচ বেড়েছে।

তিনি বলেন, স্প্রিং সিজনে নতুন অর্ডার আসছে। তবে এসব অর্ডার সময়মতো শিপমেন্ট করা যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানি সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে শিল্পকারখানাগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে পারলে আমদানি-রপ্তানি আরো বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন