অনলাইন জুয়া ছড়িয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলে, মূল ঘাঁটি বগুড়া

অনলাইন জুয়া ছড়িয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলে, মূল ঘাঁটি বগুড়া

বগুড়াসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে অ্যাপভিত্তিক অনলাইন জুয়া। বগুড়াকেন্দ্রিক এসব জুয়ায় প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। আগে গোপন আড্ডায় জুয়া বসলেও এখন আর তেমন রাখঢাক নেই, পৌঁছে গেছে ঘরে-ঘরে। এতে পরিবারগুলো নিঃস্ব হচ্ছে, সামাজিক অপরাধ বাড়ছে এবং ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ।

জেলা পুলিশের সাইবার টিম চৌকস হলেও নেই কারিগরি সাপোর্ট। অপরাধ শনাক্তে জাতীয়ভাবে ঢাকার ওপরই এখনো নির্ভরশীল। বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ জেলা পুলিশ সুপার। এজন্য অভিযান চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছেন না তারা।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়ার শিবগঞ্জ, শেরপুর, গাবতলী ও ধুনটে অনলাইন জুয়ার প্রভাব বেশি। শিক্ষার্থী, রিকশাচালক ও ব্যবসায়ীরা এতে আসক্ত হচ্ছেন। জুয়ায় ঋণগ্রস্ত হয়ে জমি বিক্রি, চুরি, খুন ও আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে।

চলতি বছরের মে মাসে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা (কালীতলা) এলাকায় অভিযান চালিয়ে খাদিজা নামে অনলাইন জুয়ার এক নারী এজেন্টকে আটক করে র‍্যাব-১২। এ সময় তার কাছ থেকে জুয়ায় ব্যবহৃত ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ‘এনজয়২৪৭’, ‘ভেলকি লাইভ’ ও ‘প্লে২৫’ প্ল্যাটফর্মে অনলাইন জুয়া পরিচালনার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

র‍্যাবের তথ্যানুযায়ী, তার ‘এনজয়২৪৭’- এর দুটি অ্যাকাউন্টে ১,৭০৩.৬৪ পিবিইউ ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যালান্স ও ২২ হাজার ৬৯৫টি লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়, যেখানে ৬৩৭ সদস্যের মধ্যে ১১ জন সক্রিয় ছিলেন। এছাড়া ‘ভেলকি লাইভ’ অ্যাকাউন্টে ৭০.৭২ পিবিইউ ব্যালান্সসহ ২,৮৪৬টি লেনদেন এবং ‘প্লে২৫’ অ্যাকাউন্টে ৬৪৪.৫৭ ডলারের ব্যালান্স পাওয়া গেছে, যেখান থেকে ২৪ ঘণ্টায় মাস্টার এজেন্টের সঙ্গে ৪০২ ডলার পাঠানো ও ১৪০ ডলার গ্রহণের প্রমাণ মেলে।

বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি ইকবাল বাহারের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দুই কোটি টাকার মতো অর্থ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ডিজিটাল জুয়ায় লেনদেন করা হচ্ছে। এই অর্থের সিংহভাগই খুব ছোট ছোট পরিমাণে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও নম্বরের মধ্যে হাতবদল করা হয়। ফলে কেবল একটিমাত্র অ্যাকাউন্ট ধরে পুরো জুয়ার চক্রটি চিহ্নিত করা বেশ জটিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জুয়ায় আসক্ত একজন জানান, অনলাইন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম যেমন বিকাশ-নগদ থেকে সরাসরি টাকা ক্যাশইন করা যায় জুয়ার মোবাইল অ্যাপগুলোয়। এরপর ২০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার কিংবা লাখ টাকা পর্যন্ত জুয়া খেলা যায় এক ক্লিকেই। টাকা দ্বিগুণের চক্রে কেউ এসব থেকে টাকা জিতছেন, কেউবা সব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন।

তার দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, ‘ওয়ানএক্সবেট’, ‘মেলবেট’, ‘মোস্টবেট’-সহ শত শত অবৈধ জুয়ার অ্যাপ ও সাইট বাংলাদেশে সক্রিয়। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতিদিনই বিদেশে পাচার হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যেমন ফেসবুক, ইউটিউব ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজের মাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের সাহায্যে নতুন ব্যবহারকারীদের প্রলুব্ধ করা হয়।

বগুড়ায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিত মুখ মুশফিকুর রহমান মুন্না জানান, কিছুদিন আগে তার ভিডিওতে অনলাইন জুয়া প্রমোট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা অফার করে জুয়াড়িরা। তিনি সেটি প্রত্যাখ্যান করে সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রিনশটের মাধ্যমে জানান ও অন্যদের সতর্ক করেন।

চলতি বছর বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় অনলাইনে জুয়া খেলার মুদ্রা কেনাবেচার ১০ লাখ টাকার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে বন্ধুদের হাতে খুন হন ব্যবসায়ী পিন্টু আকন্দ (৩৮)।

বগুড়ার একটি সেলুনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, দেশে শুধু আইপিএল বা বিপিএলের মতো ক্রিকেট আসরে নয়; বরং সারা বছরই, এমনকি প্রতিদিন জুয়া খেলা যায় অনলাইনে। তিনি নিজে এর সঙ্গে এজেন্ট হিসেবে জড়িত ছিলেন। তিনি জানান, সাধারণত আন্তর্জাতিক এই মোবাইল অ্যাপগুলো এজেন্টনির্ভর। ক্রিপ্টো বা ব্যালান্স এজেন্টের কাছ থেকে লোড দিয়ে নিয়ে সুবিধামতো পরিমাণে জুয়া খেলেন জুয়াড়িরা। এছাড়া ডলার উইথড্র না করে সেটি এজেন্টকে ট্রান্সফার করে দিয়েও ক্যাশ নেওয়া যায় এসব অনলাইন জুয়ায়।

চলতি বছরের জুনে গাবতলীতে অনলাইন জুয়ার ‘মাস্টার এজেন্ট’ সুষেন চন্দ্র রায় (৩০)-কে গ্রেপ্তার করে ডিজিটাল আলামত উদ্ধার করে গাবতলী মডেল থানা পুলিশ। তার মোবাইলে অনলাইন জুয়ার অ্যাপ ও পরিচালনার আলামত পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক জুয়ার মোবাইল অ্যাপ ওয়ানএক্সবেটের আলামতের পর সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২) ধারায় গাবতলী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।

সম্প্রতি সরকার ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইন উভয়ক্ষেত্রেই জুয়ার বিস্তার বাড়ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে জুয়া, বাজি এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধমূলক কার্যক্রম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রবণতা হ্রাস এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতিরোধে বিদ্যমান ১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ হালনাগাদ করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অনলাইন জুয়ার কারণে নির্দিষ্ট কত কোটি টাকা পাচার হয়, তার একক কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক বা নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে বগুড়া থেকে পাচার হয় প্রতিদিন এক থেকে দুই কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), আর্থিক বিশ্লেষকদের আনুমানিক হিসাব ও তদন্ত প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও অর্থনৈতিক পর্যালোচনা থেকে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

জুয়াড়িদের টার্গেট এখন বগুড়া

সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বগুড়াকেন্দ্রিক অনলাইন জুয়ার চক্রগুলো প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার করে। এ হিসাবে মাসে পাচারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকা।

জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতোয়ার রহমান ও ডিবি পুলিশের এক উপপরিদর্শ জানান, ভার্চুয়ালমাধ্যমে হওয়া এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের প্রধান জটিলতা হলোÑটাকার আসল উৎস এবং শেষ পর্যন্ত তা কোথায় যাচ্ছে তা জানা সহজ নয়। বিপুলসংখ্যক হিসাব, একাধিক মোবাইল ফোন নম্বর ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগানোর ফলে অপরাধের রহস্য উন্মোচন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বগুড়া শাখার তথ্য কর্মকর্তা বিশ্বদেব রায় উল্লেখ করেন, এ ধরনের অনিয়ম তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আলাদা বিভাগ রয়েছে। তাই স্থানীয় শাখায় এ-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে না।

এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, জেলা পুলিশ কাজ করছে। দুজনকে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। তবে টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য ঢাকায় তথ্য পাঠানো হয়। সেখান থেকে বিশ্লেষণ ও নির্দেশনা পাওয়ার পর ব্যবস্থা নিতে হয়। এই সাপোর্ট বগুড়ায় সম্ভব হলে আরো দ্রুত এসব চক্রকে নির্মূল করা সহজ হবে বলে জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন