পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে দা, বঁটি, চাপাতি ও ছুরির বাজার জমে উঠেছে। কামারের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে বেচাকেনাও। বিক্রেতারা বলছেন, সারা বছরের তুলনায় ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে, সামনে আরো বিক্রি বাড়বে। তবে ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার এসব পণ্যের দাম একটু বেশি।
আনোয়ার, সেলিম ও আল আমিন কর্মকারসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্প্রিং লোহা ও কাঁচা লোহা দিয়ে উপকরণ তৈরি করা হয় এসব উপকরণ। স্প্রিং লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান ভালো, তবে দাম বেশি। আর কাঁচা লোহার তৈরি উপকরণের দাম কিছুটা কম। এছাড়া অ্যাঙ্গেল, ব্ল্যাকবার, রড, স্টিং, রেললাইনের লোহা, গাড়ির পাতগুলো দিয়েও দা, ছুরি, বঁটি তৈরি করে থাকি। মানভেদে পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি দেড়শ থেকে ৩৫০ টাকা, চাপাতি আটশো থেকে দুই হাজার টাকা, দা সাড়ে তিনশো থেকে পাঁচশো টাকা, বঁটি সাড়ে তিনশো থেকে পাঁচশো টাকা, পশু জবাইয়ের ছুরি পাঁচশো থেকে ১৪ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের অন্তত ২৫টির মতো কামারের দোকান রয়েছে। মঙ্গলবার বিকালে সরেজমিন দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে- ঈদকে সামনে রেখে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটাকুটির কাজে ব্যবহৃত ছোট বড় আকারের চাপাতি, ছুরি, দা ও বঁটির প্রসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। দোকানগুলোতে বেশ ভিড়ও লক্ষ্য করা গেছে।
সেলিম নামের এক দোকানি বলেন, ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে এ ব্যবসা করেন তিনি। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে কোরবানির পশু ও এসব আনুষাঙ্গিক জিনিস সাধারণত ঈদের ২-৩ দিন আগে থেকে শুরু হয়। ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে, তবে সামনে আরো বিক্রি বাড়বে। সব জিনিসপত্রে দাম বেড়ে যাওয়া শ্রমিকের পারিশ্রমিকও বেড়েছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার দাম একটু বেশি।
আল আমিন নামের অপর দোকানি বলছেন, সারা বছরের তুলনায় বর্তমানে বিক্রি বেড়েছে, সামনে আরো বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার মতে, মানভেদে এ পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় একশো থেকে তিনশো টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দোকানি বলেন, বর্তমানে এ ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এ ব্যবসায় অনেকেই আসছেন, যাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ফলে তারা বাজারকে কিছুটা কুলষিত করে তুলেছে। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে হিমসিম খাচ্ছেন।
কোরবানি আর মাত্র কয়েকদিন বাকি পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানি ঈদের। এই ঈদে কমবেশি অনেকেই পশু কোরবানি করে থাকেন। পশু কুরবানির পর মাংস কাটাকুটির জন্য প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত দা, বঁটি, চাপাতি ও ছুরির। অনেকেই এ অতিরিক্ত দা, বঁটি, চাপাতি, ছুরি যত্ন করে রেখে দেন। কোরবানি এলেই সেগুলো ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করে থাকেন। অনেক দিন রেখে দেয়ার কারণে সেগুলো মরিচা পড়ে ধার কমে যায়। তাই এগুলোকে ধার দেয়ার জন্য অনেকেই কাছাকাছি কামারের দোকানে ভিড় করছেন। এ সময় ফেরি করে অনেক ফেরিওয়ালা দা, বঁটি, চাপাতি, ছুরি ধার দিয়ে থাকেন। পাড়া-মহল্লায় ফেরিওয়ালাদের হাকডাঁক শুনে তাদের কাছ থেকেও ধার দিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। এদিকে যতই ঈদ দিন ঘনিয়ে আসছে, এগুলো ধার দেয়ার জন্য টাকার পরিমাণও বাড়ছে।
কোরবানি মুসলিমদের আত্মত্যাগের অনন্য এক ইবাদত পবিত্র ঈদুল আজহা। এ সময় পশুর পাশাপাশি চাহিদা থাকে দা, ছুরি, বঁটি, চাকু, চাপাতি, কুড়ালসহ কোরবানির পশুর মাংস কাটার লোহার তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জামের। এ বছরও পশুর মাংস কাটার সে চাহিদা পূরণে ব্যস্ততা বেড়েছে পুরান ঢাকার চকবাজার, মিডফোর্ড, কেরানিগঞ্জের জিনজিরা ও কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন কামারপল্লিতে। গরম লোহাকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোয় দম ফেলার যেন সময় নেই এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের।
মঙ্গলবার সকালে কারওয়ানবাজারের কামারশালায় গিয়ে দেখা যায়, হাঁপরের টানে কয়লার চুলায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। জ্বলে ওঠা আগুনের ফুলকিতে লোহাও যেন ধারণ করেছে সূর্যবর্ণ। দগদগে গরম লোহায় দিনরাত হাতুড়ি পেটানোর টুং-টাং শব্দে মুখর কামারপল্লির এলাকাগুলো। শহর থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ে কামারপল্লিতে এখন এ শব্দে মুখর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন ব্যস্ততাও বাড়ছে। কেউবা দা, ছুরি এবং বঁটিতে শান দিতে আবার কেউবা নতুন নতুন হাতিয়ার তৈরিতে ব্যস্ত।
রাজশাহীর বছিরাবাদ আলিম মাদ্রাসার ভাইস-প্রিন্সিপাল মাওলানা ইয়াহহিয়া বলেন, কোরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করতে লোহার তৈরি ধারালো অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। এজন্যই ঈদুল আজহায় কামারদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

