সাক্ষাৎকার

‘জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে শুল্ক আরোপের কোনো ভিত্তি নেই’

‘জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে শুল্ক আরোপের কোনো ভিত্তি নেই’

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে নতুন করে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কারোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বন্ধে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় বাংলাদেশসহ ৬০ দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে নতুন করে শুল্কারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুল্কারোপের যৌক্তিকতা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে আমার দেশ-এর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

বিজ্ঞাপন

আমার দেশ : বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে বাণিজ্যে কতটা প্রভাব পড়তে পারে?

মোহাম্মদ হাতেম : এখনই অতটা দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কারণ, নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ হলেও মোট শুল্কহারে আপাতত কোনো পরিবর্তন আসছে না। গত ফেব্রুয়ারিতে যে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছিল, সেটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপরও একই হারে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছে। ফলে মোট শুল্কের ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও এখনো বহাল আছে।

আমার দেশ : কিন্তু গত এক বছরে বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কাঠামোতে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন এসেছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ হাতেম : গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্কারোপ করা হয়েছিল। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। বাণিজ্যচুক্তির পর পাল্টা শুল্ক কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করলে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের আওতায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়। সেটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছে। ফলে গত ১৪ মাসে কয়েক দফা শুল্ক পরিবর্তনে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আমার দেশ : নতুন শুল্কারোপের ফলে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান কী?

মোহাম্মদ হাতেম : বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয় হলো, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের ওপর ১২ দশমিক পাঁচ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের শুল্ক ব্যবধান দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ। এতে মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পুরোপুরি পিছিয়ে পড়বে না। বরং এই ব্যবধান কিছুটা সুবিধা দেবে। তবে ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরো কঠিন হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুল্কের ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ যেন পিছিয়ে না পড়ে।

আমার দেশ : মার্কিন ক্রেতারা কি নতুন শুল্ক বিবেচনায় নিয়েই পোশাকের দর নির্ধারণ করছেন?

মোহাম্মদ হাতেম : পাল্টা শুল্ক স্থগিত হলেও মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তার সমপরিমাণ শুল্ক হিসাব করেই তৈরি পোশাকের দরকষাকষি করে আসছে। কারণ, তাদের ধারণা ছিল অন্য কোনো উপায়ে ওই পরিমাণ শুল্কারোপ হতে পারে। এখন পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে তেমন কিছুই হতে যাচ্ছে। তবে কোনো কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর উপর শুল্কহার বাংলাদেশের তুলনায় কম হলে আমাদের পণ্য রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে যেতে পারেন এবং আমাদের অর্ডার কমে যেতে পারে।

আমার দেশ : যুক্তরাষ্ট্র বলছে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি বন্ধে অনেক দেশ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এ অভিযোগের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

মোহাম্মদ হাতেম : বাংলাদেশে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। আমাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিষয়টি যাচাই করতে পারে। আমাদের নোটিস দিয়ে জানতে চাইতে পারে কেন এমন হচ্ছে। কিন্তু তেমন কোনো প্রক্রিয়া আমরা দেখিনি। বরং কোনো ভিত্তি ছাড়াই জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের উপর বাড়তি শুল্ক চাপানো হচ্ছে, যা আমরা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারি না।

আরেকটি বিষয় হলো, বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে, সেসব দেশে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ থাকলে তার দায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের উপর চাপানো যৌক্তিক নয়। আমরা যে দেশগুলো থেকে কাঁচামাল কিনি, সেখানে কী পরিস্থিতি রয়েছে, তা সব সময় যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকে শাস্তি দেওয়া ন্যায্য নয়।

আমার দেশ : তাহলে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে বাংলাদেশের ওপর শুল্কারোপের সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ হাতেম : তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নজরদারির আওতায় থাকা শিল্পগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, বিভিন্ন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেতাদের কঠোর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাতে শ্রমমান আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। তাই এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের ওপর বাড়তি শুল্ক চাপানো ন্যায্য নয়। আসলে আমি এটাকে ‘ট্রাম্প ট্যারিফ’ বলি। এই ট্যারিফের কোনো যৌক্তিকতা বা ভিত্তি নেই। এটি অন্যায় ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। সত্য বলতে যেকোনো উপায়ে শুল্ক বহাল রাখাই তাদের উদ্দেশ্য।

আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ জানাব, তারা যেন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে এবং বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে। জোরপূর্বক শ্রমের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করব।

আমার দেশ : এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আপনাদের কোনো আলোচনা হয়েছে কী?

মোহাম্মদ হাতেম : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও আলোচনা থাকা জরুরি। কারণ, এটি শুধু একটি খাতের বিষয় নয়; বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

আমার দেশ : সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ হাতেম : মূল চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা। গত কয়েক বছরে নানা সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এর মধ্যে একের পর এক শুল্ক পরিবর্তন ও নতুন শুল্কারোপ রপ্তানি বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ফলে অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কহার সুবিধাজনক থাকলে সে সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

আমার দেশ : এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় কী?

মোহাম্মদ হাতেম : আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বাংলাদেশি পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য উন্নত করতে হবে। একইসঙ্গে নতুন বাজার খুঁজতে হবে এবং বিদ্যমান বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুলা ব্যবহারের শুল্কছাড়ের বিষয়টি কার্যকর করার উদ্যোগও নিতে হবে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ কমিয়ে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন