রমজানের শুরুর দিকে খুচরায় প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ রাজধানীর অভিজাত এলাকার বাজারগুলোতে একই পণ্য বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সেই টমেটো গতকাল শুক্রবার কারওয়ান বাজারে বিক্রি হয়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। তাই ১২ থেকে ১৩ দিনের ব্যবধানে টমেটোর দাম কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি।
একইভাবে রোজার শুরুতে খুচরায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। বর্তমানে সেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ৩০ টাকায়। সে হিসাবে পেঁয়াজের দাম কমেছে ৫০ শতাংশ।
শুধু টমেটো কিংবা পেঁয়াজ নয়, রোজার কয়েকদিন আগের তুলনায় বর্তমানে খেজুর, ছোলা, মুড়ি, চিনি, মাছ, মাংস, ডিম ও শাকসবজি-তরিতরকারিসহ বেশকিছু ভোগ্যপণ্যের দাম কমায় জনমনে স্বস্তি বিরাজ করছে।
রমজানের শুরুতে চিনি বিক্রি হয় ১৩০ টাকা, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। প্রতি হালি মুরগির ডিম বিক্রি হতো ৪০ থেকে ৪৮ টাকায়, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৮ টাকায়। ডিম ব্যবসায়ী আল-আমিন বলেন, রমজানে ডিমের চাহিদা কম থাকে, সামনে ডিমের দাম আরো কমতে পারে।
কয়েকদিন আগের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। ৩০০ টাকার লেয়ার মুরগি ২৭০ টাকা এবং সোনালি কক ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে দেশি মুরগি ও হাঁসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দেশি মুরগি ৫৫০ এবং হাঁস ৭০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। রমজানের তিন-চারদিন আগে গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা ৭৪০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খাসির মাংসের দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কয়েকদিনের ব্যবধানে মাছের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা কমেছে। তেলাপিয়া ১৬০, পাঙাশ ২০০, রুই আকারভেদে ২৮০ থেকে ৪০০, কাতল আকারভেদে ৩০০ থেকে ৬০০, পাবদা ৩৫০, বোয়াল আকারভেদে ৫৫০ থেকে হাজার, বেলে ৫০০, বড় শোল ৬৫০, মাগুর ৫০০, বাটা ৫৫০ ও দেশি ট্যাংরা ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারিতে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা বোতলজাত সয়াবিন তেল সংকটের সমাধান হয়েছে। সংকটকে পুঁজি করে আগে বেশি দামে সয়াবিন তেল বিক্রি হলেও বর্তমানে সরকার নির্ধারিত ১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিনের দাম সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কমে বিক্রি হচ্ছে।
সপ্তাহের ব্যবধানে চিকন (মিনিকেট) চালের দাম বস্তা প্রতি ১০০ টাকা বেড়েছে। তবে মোটা চালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানে ভালো মানের মিনিকেট চাল মানভেদে ৭১ থেকে ৮৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা স্বর্ণা গুটিচাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়।
কারওয়ান বাজারের চাটখিল রাইস এজেন্সির রাসেল বলেন, চালের বাজারে এখনো সিন্ডিকেট সক্রিয়। সরকার ইচ্ছা করলে অন্যান্য পণ্যের মতো চালের দামও কমাতে পারে। আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি চাল সরবরাহকারী মিলমালিকদের গোডাউনে অভিযান চালালে চালের দাম কমতে বাধ্য। বড় বড় মিলমালিকরা হাজার হাজার টন চাল মজুত রেখে দফায় দফায় চালের দাম বাড়াচ্ছে।
ইব্রাহিম হোসেন নামে রাইস এজেন্সির একজন বলেন, ইরি ধান না ওঠা পর্যন্ত চালের বাজার অস্থির থাকতে পারে। তবে সরকার আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি মজুতদারি বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে চালের দাম কমতে পারে।
এদিকে পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ছোলা। রোজার মাঝামাঝিতে চাহিদা কমায় পাইকারি বাজারে ছোলার দাম অনেক কমলেও খুচরা বাজারে পাঁচ থেকে ১০ টাকা কমে এখন ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রমজানে রোজাদারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্য খেজুর। রমজানের শুরুতে যে খোলা খেজুর ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তা কমে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খুচরা বাজারে মেডজুল, আজোয়া ও মরিয়ম জাতের খেজুর উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে।
লেবুর দাম একটু চড়া হলেও শসার দাম কমেছে। প্রথম রমজানে ৫০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া শসা বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫০-৬০ টাকার খিরা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগেও যে লেবুর দাম ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা হালি, দুই-তিনদিনের ব্যবধানে তা ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে রমজানে কাঁচা সবজি ও তরিতরকারির দাম ক্রেতার নাগালে রয়েছে। ৮০ টাকার কাঁচামরিচ এখন ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গাজর ২০ থেকে ২৫ টাকা, বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শিম ৩০-৪০, ফুলকপি ২০, টমেটো ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফলেও দামও কমেছে। কারওয়ান বাজারের ফল বিক্রেতা সোহাগ, খোকন ও আবু সাঈদ বলেন, কেজি প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা কমেছে ফলের দাম। বর্তমানে আপেল ৩০০, কমলা ২৮০, ডালিম ৩৮০, নাশপাতি ৩০০, আঙুর ২৮০ থেকে ৩৮০, মাল্টা ২৪০ এবং তরমুজ ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বছরের শুরু থেকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, রমজানে বাজারে সবকিছুর দাম স্থিতিশীল থাকবে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিদপ্তর একাধিক বৈঠকও করেছে ব্যবসায়ীদের নিয়ে। এসব বৈঠক থেকে পণ্যের দাম না বাড়ার আশ্বাস এসেছে।
টিসিবির মাধ্যমে স্মার্টকার্ড ও ট্রাকসেলের মাধ্যমে পণ্য বিক্রিসহ সরকারের নানা ইতিবাচক পদক্ষেপে এবার মাহে রমজানের বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম সহনীয় রয়েছে বলে মনে করছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা।
সার্বিকভাবে চাল ছাড়া সব পণ্যের সরবরাহ ও দামের বিষয়ে ভোক্তাদের মধ্যে একধরনের স্বস্তি বিরাজ করছে।
হালিমা খাতুন নামের এক ক্রেতা বলেন, বিগত দেড় যুগের মধ্যে এবারই প্রথম মাহে রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম কিছুটা হলেও সহনীয় রয়েছে।
মুদি ব্যবসায়ী আল আমীন বলেন, বাজার মনিটরিংয়ে অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণেই এবার মাহে রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম কমেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

