সেমিনারে বক্তারা

অর্থনীতি আটকে আছে তিন ফাঁদে

অর্থনীতি আটকে আছে তিন ফাঁদে
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে শনিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির ‘স্টেট অব দ্য রিয়াল ইকোনমি’ শীর্ষক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অতিথিরা। ছবি: আমার দেশ

দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা—এই তিন কাঠামোগত ফাঁদে আটকে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। একদিকে আয় বাড়ছে না, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবারের ব্যয় ও ঋণের বোঝা। একই সঙ্গে কমছে বিনিয়োগের গতি, নিম্নমুখী হচ্ছে প্রবৃদ্ধি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘স্টেট অব দ্য রিয়াল ইকোনমি’ শীর্ষক প্রকাশনায় এসব চিত্র উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে শনিবার আয়োজিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি জানান, দেশে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৭.৯ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫ শতাংশে। ব্যয়ভিত্তিক জিনি সহগ (জিনি কো-এফিশিয়েন্ট) বেড়ে হয়েছে ০.৪৩৬।

প্রকাশনার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বা ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যারা স্থবির আয়, বাড়তি ব্যয় ও অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত। ফলে চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

পিপিআরসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শুধু বহিরাগত অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে নয়। একই সঙ্গে ‘উচ্চ দারিদ্র্য-নিম্ন বিনিয়োগ-নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র একটি কাঠামোগত ফাঁদে আটকে পড়েছে।

হোসেন জিল্লুর বলেন, দেশে দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণিও ক্রমে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর সক্ষমতা কাঠামোগত সীমায় পৌঁছেছে। দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্তের ভঙ্গুরতা নিয়ে পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও মিল পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক ফাঁদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো পরিবার পর্যায়ে আর্থিক সংকটের বিস্তার। দারিদ্র্য, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, ছদ্ম বেকারত্ব ও চিকিৎসা ব্যয় মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অর্ধেকের বেশি পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত। পাশাপাশি সঞ্চয়ের তুলনায় পারিবারিক ঋণের বোঝা ৪৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো বিনিয়োগে স্থবিরতা ও প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী গতি। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মূল্যায়নেও বিনিয়োগের স্থবিরতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা।

জিল্লুর রহমান বলেন, এ সংকট থেকে বের হতে হলে পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কমাতে হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হবে এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটি সাময়িক দুরবস্থা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকট। তাই শুধু কমিশন গঠন বা নীতিপ্রতিবেদন প্রকাশ করলেই হবে না। সমাজ, সরকার ও অর্থনীতির সমন্বয়ে কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনা নিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বিনিয়োগের স্থবিরতা ও সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংকট স্বীকার করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ জন্য অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও শাসনব্যবস্থার সংস্কার—এই পাঁচটি স্তম্ভের ভিত্তিতে সমন্বিত ‘ট্রানজিশন কমপ্যাক্ট’ বা উত্তরণকালীন সমঝোতা গড়ে তুলতে হবে।

তার মতে, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে হয়রানি মানুষের উদ্যোগ, সক্ষমতা ও স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই কাঠামোগত সংস্কারের মূল লক্ষ্য হতে হবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে হয়রানিমুক্ত করা।

সংস্কারের তাগিদ অর্থনীতিবিদদের

বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেম বলেন, অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় বাণিজ্য, সরকারি অর্থব্যবস্থা ও জ্বালানি দক্ষতায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। কর্মসংস্থান বাড়াতে শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে। অথচ প্রবৃদ্ধির সুফল আগের মতো দারিদ্র্য কমাতে পারছে না। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক প্রায় ২২ শতাংশ বাড়লেও দারিদ্র্যসীমা সমন্বয় করা হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ।

তার হিসাব অনুযায়ী, শীর্ষ ১০ শতাংশ ও সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের অনুপাত ২০২২ সালের ৩ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২ হয়েছে। রাজস্ব আদায় কম থাকায় সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃষিতে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োজিত থাকলেও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান মাত্র ১২ শতাংশ। কৃষিকে শিল্প ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দুই দশক আগে মোট রপ্তানিতে এ খাতের অংশ ছিল ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, চামড়া, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো সম্ভাবনাময় খাত বিকল্প প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। নীতি সহায়তা পাওয়ার পরও এসব খাত কেন এগোতে পারছে না, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও তরুণদের কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কতজন কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন, তার কার্যকর মূল্যায়নও জরুরি।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির খাদ্যমূল্যের চাপ ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের অনিশ্চিত আয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি নারী কর্মসংস্থান, শিশুযত্ন কেন্দ্র এবং লিঙ্গসংবেদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

পিপিআরসির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ড. সৈয়দ এম হাশমির স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা বক্তব্য দেন।

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...