মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কবল থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার শিবপুর, ধনিয়া এবং মেদুয়া এলাকা রক্ষায় ৬৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে। পুরো অর্থই সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে ব্যয় করা হবে। নদীতীর সংরক্ষণ, উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, বাঁধের ঢাল সুরক্ষা এবং পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানোই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।
তবে মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলাধীন শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষা প্রকল্পটি একনেকে যাওয়ার আগে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) একাধিক বিষয়ে আপত্তি জানায়। বিশেষ করে মাত্র চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ৫০৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়কে অত্যধিক বলে মন্তব্য করে ব্যয় পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে কয়েকটি খাত বাদ দিয়ে নামমাত্র কিছু ব্যয় কমিয়ে ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা করা হয়। একই সঙ্গে বাঁধ পুনর্বাসন, ঢাল সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও ক্রয় পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশোধন এনে পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের একনেকের জন্য প্রস্তুত করা সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।
কেন প্রয়োজন এই প্রকল্প
সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, মেঘনা নদীর ভাঙনে প্রতি বছর ভোলা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হচ্ছে। বর্তমানে ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ও ধনিয়া ইউনিয়ন এবং দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নের প্রায় চার কিলোমিটার অরক্ষিত অংশে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে অতিজোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ছয় কিলোমিটার মাটির বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পোল্ডারের ভেতরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এতে কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, বসতভিটাসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতাও তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নদীতীর সংরক্ষণ, উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ঢাল সুরক্ষা এবং দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কী কী কাজ হবে
প্রকল্পের আওতায় চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ এবং দুটি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণ করা হবে। সরকারের দাবি, এসব কাজ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩ হাজার ৮০৪ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাবে। পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতার হাত থেকে সুরক্ষিত হবে। এছাড়া প্রায় ৬৫ হাজার ৪৭২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ব্যয়ের বড় অংশ নদীতীর সংরক্ষণে
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় ধরা হয়েছে নদীতীর সংরক্ষণ কাজে। মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পিইসি সভায় এ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সভায় বলা হয়, চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ৫০৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার প্রাক্কলন অত্যধিক মনে হচ্ছে। তাই ব্যয় পুনর্বিবেচনা করে কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
জবাবে পাউবো জানায়, প্রকল্প এলাকায় নদীর স্কাওয়ার গভীরতা মাইনাস ৩৩ মিটার এবং পানির প্রবাহের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ দশমিক ০৬ মিটার। এ কারণে স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ৫০ থেকে ৭০ মিটার অ্যাপ্রন এবং প্রতি মিটারে ৯৫ ঘনমিটার ডাম্পিং ভলিউম প্রয়োজন। এর মধ্যে অর্ধেক জিওব্যাগ এবং বাকি অর্ধেক কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থাটির মতে, এর চেয়ে কম উপকরণ ব্যবহার করলে স্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।
আরো যেসব আপত্তি তোলা হয়
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পিইসি সভায় শুধু নদীতীর সংরক্ষণ নয়, আরো কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। দৌলতখানের মেদুয়া ইউনিয়নের ৮০০ মিটার বাঁধে কংক্রিট ব্লক ব্যবহার না করে কেবল টার্ফিংসহ মাটির বাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাঁধ পুনর্বাসন ও ঢাল সুরক্ষা কাজের ব্যয় পৃথকভাবে দেখাতে বলা হয়। প্রতি ২০০ থেকে ২৫০ মিটার অন্তর প্রয়োজনীয় মাটির পরিমাণ ছক আকারে উপস্থাপনের নির্দেশও দেওয়া হয়।
এছাড়া পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণের ব্যয় ৩১ কোটি টাকার মধ্যে সীমিত রাখা, মূল্য ও ভৌত কন্টিনজেন্সি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা নির্ধারণ, প্রকল্প-পরবর্তী বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা এবং ক্রয় পরিকল্পনায় পদ্ধতি ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক দাবি
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২৩ সালের মে মাসে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) সম্পন্ন করে। ওই সমীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ধরে প্রকল্পটির নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এনপিভি) ২২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) ১ দশমিক ৫৬ এবং অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। তাই পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। তবে এটি থেকে সরাসরি কোনো আর্থিক আয় হবে না বলে পৃথক আর্থিক বিশ্লেষণ করা হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের মত
পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো মেঘনার ভাঙন থেকে সুরক্ষা পাবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী হওয়ায় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে। এসব বিবেচনায় কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




