অন্য পণ্য না নিলে মিলছে না বোতলজাত তেল

সরদার আনিছ

অন্য পণ্য না নিলে মিলছে না বোতলজাত তেল

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও দাম বাড়ার সঙ্গেই বাজারে বেড়েছে ভোজ্যতেলের দাম। কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ ব্যাপকহারে কমিয়ে দেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। তারা বলছেন, সংকট এতটাই জটিল যে কোনো কোনো কোম্পানি তাদের অন্য পণ্য না নিলে শুধু বোতলজাত পণ্য দিচ্ছে না।

বেশিরভাগ খুচরা দোকানেই বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কারও কাছে থাকলেও ক্রেতাকে শর্ত দিয়ে বেশি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৯৫৫ টাকার পাঁচ লিটারের বোতল ৯৬০ থেকে ৯৭০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এক-দুই লিটারের বোতলও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

খোলা সয়াবিনের তেলের দামও বেড়েছে। খোলা সয়াবিনের লিটার ১৯৫ থেকে ১৯৮ টাকা ও পামঅয়েলের লিটার ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও সরকার নির্ধারিত ৫ লিটারের বোতল ৯৫৫ টাকা, লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিন তেল ১৭৬ টাকা ও পামঅয়েল ১৬৬ টাকা বিক্রি হওয়ার কথা।

গতকাল সোমবার কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে তেজকুনিপাড়া থেকে আসেন নাছিমা নামের এক গৃহবধূ । তিনি জানান, কয়েক দোকান ঘুরেও তিনি ৫ লিটারের সয়াবিন তেল কিনতে পারেননি। পরে দোকানদারের শর্ত মেনে আরো কয়েকটি পণ্যের সঙ্গে ১০ টাকা বেশি দাম দিয়ে ৯৬০ টাকায় পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেল কিনেন।

কারওয়ান বাজারের চিকেন মার্কেটের মুদি ব্যবসায়ী ইমাম উদ্দীন বাবলু আমার দেশকে বলেন, ফ্রেশ ছাড়া অন্য সব কোম্পানিই বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রূপচাঁদা ও পুষ্টি কোম্পানি সপ্তাহে দুয়েকদিন চাহিদার তুলনায় সিকি অংশ সরবরাহ করলেও তারা এর সঙ্গে আটা, সরিষার তেল ও চা পাতা নেওয়ার শর্ত যোগ করে। তা না হলে ডিলাররা শুধু বোতলজাত সয়াবিন তেল দিতে চান না।

এদিকে সম্প্রতি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়ার কথা তুলে ধরে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দেয়। এ নিয়ে ১২ এপ্রিল ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল ওয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বৈঠক করলেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) দেওয়া প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে দাম না বাড়ানোর পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়। এর বদলে কারখানার মালিকদের অন্যভাবে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ওইদিন বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ভোজ্যতেলের দাম আপাতত বাড়ছে না। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে কোনো ধরনের সংকট বা অস্থিরতা যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সরকার দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

তিনি আরো বলেন, কোনো পণ্যেরই দাম বাড়াতে চায় না সরকার। যদিও বাজারে কিছু ব্র্যান্ডের তেলের সরবরাহ কম রয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও মফস্বল এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোতলজাত সয়াবিন তেলের এ সরবরাহ সংকট চলছে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে। কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে সরবরাহ করে আসছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলে লাভের পরিমাণ কমে যাওয়াতেই তারা সরবরাহে অনাগ্রহী। ফলে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা।

গতকাল রাজধানীর নয়াবাজারে গিয়ে দোকানগুলোতে এক-দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল কম দেখা যায়। ৫ লিটারের বোতল রাখা দোকানের সংখ্যা ছিল খুবই কম।

কারওয়ান বাজারের দোকানগুলোতেও বোতলজাত সয়াবিন কম দেখা গেছে। এ বিষয়ে মুদি ব্যবসায়ী রাসেল মিয়া বলেন, ২০ রমজানের পর যুদ্ধের কথা বলে অনেক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছিল। এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কথা বলে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে।

এ ব্যবসায়ী বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট ও দাম বাড়ায় আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অনেক নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এ আশঙ্কায় অনেকে মজুদ থাকলেও বিক্রি কম করছেন। অন্যান্য পণ্য না নিলে কারো কাছে শুধু সয়াবিন তেলের বোতল বিক্রি করছেন না। তিনি আরো বলেন, আগে এক-দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি করলে ৫-৭ টাকা এবং ৫ লিটারের বোতলে ২০ টাকা কমিশন দেওয়া হতো। এখন ১ থেকে ৫ টাকা দেওয়া হয়।

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের দোকানি আলিম উদ্দিন বলেন, এক-দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি করে এখন কোনো লাভ হয় না। সরবরাহও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকে বাড়তি দামেও বিক্রি করছেন।

কেরানীগঞ্জ বউবাজারের দোকানি নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট চলছে। বেশিরভাগ দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কোথাও কোথাও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ সংকট কাটাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সর্বশেষ গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছয় টাকা বাড়ানো হয়। ওইসময় এক লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৯৫ টাকা, দুই লিটার ৩৯০ টাকা ও ৫ লিটারের বোতলের দাম ৯৫৫ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। এরপর কোম্পানি পর্যায়ে আর দাম না বাড়লেও পরিবেশক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে । গত দেড় মাসে পরিবেশক পর্যায়ে দাম বাড়ায় খুচরা পর্যায়েও বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও কিছুটা বেড়ে গেছে। পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিতে পাঁচ টাকার মতো বেড়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন আমার দেশকে বলেন, সরকারি নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। কোম্পানিগুলো রমজানের আগেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু তখন দাম বাড়াতে না পেরে সরবরাহ ও কমিশন কমিয়ে দিয়ে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এতে কোম্পানিগুলো কৌশলে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সরকারকে বাধ্য করতে চাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন