বিশিষ্ট হাদিসবিশারদ ও গবেষক মাওলানা আব্দুল মতিন রচিত ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিযি’-এর ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনা উপলক্ষে রাজধানীতে আন্তর্জাতিক ইলমি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান আলেম, মুহাদ্দিস, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সেমিনারে গ্রন্থটির গবেষণামূল্য, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং হাদিসশাস্ত্রে এর অবদান তুলে ধরা হয়।
বুধবার ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘হাদিস অনুসরণে সালাফের কর্মপন্থা: প্রসঙ্গ জামে তিরমিযি ও কিফায়াতুল মুগতাযি’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। হাজারো আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে মিলনায়তন পরিণত হয় এক ব্যতিক্রমধর্মী ইলমি সমাবেশে।
সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবুল কাসেম নোমানী। তিনি বলেন, “বহু বছরের নিরলস পরিশ্রম ও গবেষণার ফল এই গ্রন্থ। জামে তিরমিযি–এর ব্যাখ্যা রচনার মাধ্যমে লেখক এমন একটি কাজ সম্পন্ন করেছেন, যা উম্মাহর জন্য দীর্ঘদিন উপকারী হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেন, কুরআন-সুন্নাহর খেদমতে নিবেদিত এ ধরনের গবেষণাকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ এবং আল্লাহ তাআলা যেন এ গ্রন্থকে উম্মাহর জন্য কবুল করেন।
সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস, লেখক ও গবেষক মাওলানা আবুল বাশার বলেন, প্রায় তিন দশকের নিবিড় সাধনা ও গবেষণার মাধ্যমে রচিত এই গ্রন্থ হাদিসশাস্ত্রে বাংলাদেশের এক অনন্য অবদান। তিনি বলেন, “হাদিস পাঠদান ও গবেষণার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং দরসের মান ও পদ্ধতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।”
স্বাগত বক্তব্যে মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের পরিচালক শায়খ তাহমিদুল মাওলা জানান, গ্রন্থটির প্রথম চার খণ্ড প্রকাশের পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট আলেম মুফতি হোসাইন কাদুদিয়া গ্রন্থটির উচ্চ প্রশংসা করেছেন। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনার সমমানের মুদ্রণ ও সম্পাদনার মাধ্যমে গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গ্রন্থের রচয়িতা, জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া মোহাম্মদপুর ঢাকার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল মতিন বলেন, “এটি আনন্দের নয়; বরং শুকরিয়া ও দোয়ার মজলিস।” তিনি জানান, ২০০১ সালে জামে তিরমিযি–এর দরসদান শুরু করার পর থেকেই এ গ্রন্থের গবেষণাকাজ শুরু হয়। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মূল রচনা সম্পন্ন হলেও এর পেছনে রয়েছে প্রায় ২৬ বছরের গবেষণা, হাজারো গ্রন্থ অধ্যয়ন এবং অসংখ্য নির্ঘুম রাতের শ্রম। তিনি এ কাজে সহযোগিতার জন্য বিশেষভাবে মাওলানা আব্দুল মালেকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং গ্রন্থটি উম্মাহর জন্য কল্যাণকর হওয়ার দোয়া কামনা করেন।
সেমিনারে ‘হাদিস অনুসরণে সালাফের কর্মপন্থা: প্রসঙ্গ জামে তিরমিযি ও কিফায়াতুল মুগতাযি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, জামে তিরমিযি–এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মতভিন্নতার মধ্যেও ইলমি শিষ্টাচার ও আদবের সংরক্ষণ, যা এ ব্যাখ্যাগ্রন্থেও অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়ার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গাফফার বলেন, প্রায় ২৬ বছরের গবেষণার ফসল এই গ্রন্থ। একটি শব্দের ব্যাখ্যার জন্যও লেখক শত শত মূল গ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে হাদিস গবেষণার ইতিহাসে এ গ্রন্থ বাংলাদেশের এক গৌরবময় অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার আলেম শায়খ ইসহাক বানা, সিলেটের প্রবীণ মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুল হক সুরাইঘাটি, মক্কার আলেম ড. শায়খ আব্দুল আজিজ আলহাজ এবং দারুল উলুম দেওবন্দের শুরা সদস্য শায়খ হাসান মাহমুদ রাজস্থানী বক্তব্যে গ্রন্থটির গবেষণামূল্য, পূর্ণাঙ্গতা ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, জামে তিরমিযি–এর পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসেবে এটি সমকালীন হাদিসচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
এ ছাড়া মালিবাগ জামিয়ার শায়খুল হাদিস মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ, ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতি আবু সাঈদ, আকবর কমপ্লেক্সের প্রধান মুফতি দিলাওয়ার হোসাইনসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম-উলামা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে হাদিস গবেষণার ধারা বিস্তারে নির্বাচিত ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’-এর ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সেট বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়।
সবশেষে বিশিষ্ট আলেম, সিনিয়র মুহাদ্দিস এবং জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া ঢাকার মুহতামিম মাওলানা মাহমুদুল হাসান দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন। তাঁর দোয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক এ ইলমি সেমিনারের সমাপ্তি ঘটে।
উল্লেখ্য, ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিযি’ একজন বাংলাদেশি আলেমের কলমে রচিত জামে তিরমিযি–এর পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। ১৭ খণ্ডে প্রকাশিত এ গ্রন্থকে হাদিস গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে আখ্যায়িত করছেন দেশ-বিদেশের বহু আলেম, গবেষক ও ইসলামী শিক্ষাবিদ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


