ডেঙ্গু নিয়ে লক্ষাধিক রোগী গত বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা নেওয়া এসব রোগীর অধিকাংশ সুস্থ হলেও মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। তবে এসব মৃত্যুর পেছনের কারণ আজও অজানা। গত ছয় মাসেও মৃত্যুর পর্যালোচনা (ডেথ রিভিউ) করতে পারেনি সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। চলতি বছরও এখন পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে, জানা যায়নি কারণ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্য খাতের অন্তত ৩০টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয় পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বা অপারেশন প্ল্যান (ওপি)। কিন্তু সরকার সেখান থেকে সরে আসায় স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি কর্মসূচিতে চরম আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। এতে শুধু টাকার অভাবে মৃত্যু পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়নি।
গতকাল বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) আয়োজিত মৌসুম-পূর্ব এডিস সার্ভে-২০২৫ সালের ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘মৃত্যু পর্যালোচনার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার (গত বছরের নভেম্বরে) পরপরই একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু যে মাধ্যমে টাকা আসবে সেই ওপি বন্ধ হওয়ায় তা আর এগোয়নি। কমিটি গঠন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।’
জানা গেছে, শুধু মৃত্যু পর্যালোচনা নয়, অন্যান্য বছর জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ডেঙ্গু সংক্রমণের জরিপ করে। কিন্তু এ বছর টাকা না থাকায় সেটিও করতে পারেনি। সংক্ষিপ্ত পরিসরে আইইডিসিআর এই জরিপ করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৩ সালে তিন লক্ষাধিক ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ওই বছর মারা যায় ১৭শ’র বেশি মানুষ। এত মৃত্যুর পরও এর নেপথ্য কারণ পর্যালোচনা নিয়ে টালবাহানা করেন তৎকালীন সিডিসির দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। অনেকটা চাপের মুখে হাতেগোনা কিছু নমুনা পর্যালোচনা করা হয়। সেই প্রতিবেদনও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ডা. শেখ দাউদ আদনানের কাছে বার বার প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে এড়িয়ে যান তিনি। তবে প্রতিবেদন না পেলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর জানান, ‘ডেঙ্গু মৃত্যুর বেশিরভাগই হয়েছে শক সিন্ড্রোমে। দেরিতে হাসপাতালে আসায় এসব রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যার অধিকাংশই ঘটেছে ভর্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে।’
এদিকে গতকাল প্রকাশিত আইইডিসিআরের প্রাক-মৌসুম জরিপে বলা হয়েছে, মৌসুম শুরুর আগেই রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট মানদণ্ডের থেকেও বেশি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চালানো জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকার দুই সিটির ৯৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টিতে ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি। এর অর্থ হচ্ছে, এসব এলাকার ১০০টির মধ্যে ২০টির বেশি পাত্রে মশা বা লার্ভা পাওয়া গেছে। এই এলাকাগুলো ডেঙ্গুর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির ঝুঁকিতে থাকা ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১২, ২, ৮, ৩৪, ১৩ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ড। আর দক্ষিণের ওয়ার্ড ৩১, ৪১, ৩, ৪৬, ৪৭, ৪ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর সিটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে ১২ নম্বর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডে এডিসের ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ২৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ২, ৮ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড। এগুলোতে ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ২৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ ছাড়া ১৩ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ২০ শতাংশ ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া দক্ষিণের ৩১ এবং ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ঢাকার সবচেয়ে বেশি- ২৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর বাইরে ৩, ৪৬ ও ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে ২৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং ৪ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ২০ শতাংশ ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

