জিনজিরা পীর মোহাম্মদ পাইলট বালিকা বিদ্যালয়

অনিয়ম, প্রশাসনিক সংকট, শিক্ষকদের দলাদলিতে শিক্ষার মান তলানিতে

অনিয়ম, প্রশাসনিক সংকট, শিক্ষকদের দলাদলিতে শিক্ষার মান তলানিতে

ঢাকার কেরানীগঞ্জে একসময় নারী শিক্ষার অন্যতম আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল জিনজিরা পীর মোহাম্মদ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকসহ অভিজ্ঞ একাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা, শিক্ষকদের দলাদলি, আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগে বিধি লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নের মুখে।

এছাড়া দুই হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর এ স্কুলটিতে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, বিনা টেন্ডারে উন্নয়ন কাজসহ বেশকিছু অনিয়মেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব কারণে বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে বিভিন্ন অভিযোগে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবু রায়হান বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সিনিয়র শিক্ষক সাবিহা খাতুন ও দেওয়ান মোহাম্মদ শাকিল থাকা সত্ত্বেও ড্রেস মেকিং বিভাগের শিক্ষিকা তাহমিনা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী ড্রেস মেকিং, ফিজিক্যাল টিচার, মৌলভী ও প্রদর্শক পদে কর্মরত শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হওয়ার সুযোগ নেই। তা ছাড়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে হলে স্নাতক ডিগ্রিধারী সহকারী শিক্ষক পদে ১৫ থেকে ১৮ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকার বিধান রয়েছে। যা বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তাহমিনা আক্তারের নেই।

২০২৩ সালে এক অভিভাবক কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ করেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাসহ তিনজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগ ও সনদ নিয়ে অনিয়ম রয়েছে। অভিযোগে আরো বলা হয়, কারিগরি শাখার কিছু শিক্ষক দুই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন গ্রহণ করছেন এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ সনদ ব্যবহার করে চাকরি করছেন। এছাড়া শিক্ষা সনদের ক্ষেত্রেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় রয়েছে তৃতীয় বিভাগ, যা শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞাপন মোতাবেক চাকরি প্রাপ্তিতে অনুপযোগী।

জানা গেছে, এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের পদ চার বছর, সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ দুই বছর এবং ক্রীড়া শিক্ষকের পদ চার বছর ধরে শূন্য রয়েছে।

এদিকে বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক আবু রায়হানকে ফিরিয়ে আনাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কোন্দল ও দলাদলিতে জড়িয়ে পড়েছেন স্কুলটির শিক্ষকরা। তাকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের একটি পক্ষ গ্রুপিং ও লবিং করছে। জাকিরুল ইসলাম, হাসানুল কবির, সাহেব আলী শাকিল ও সুনীল চন্দ্র রায়সহ চার-পাঁচজন অবস্থান নিয়েছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তাহমিনা আক্তার বিপক্ষে। তাদের বক্তব্য তাহমিনা আক্তার ড্রেস মেকিংয়ের শিক্ষিকা। জেনারেল লাইনের শিক্ষক এবং ১৫ থেকে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রধান শিক্ষিকা হওয়ার বিধান নেই। বরখাস্ত আবু রায়হান নিজেও বিভিন্ন জায়গায় লবিং করছেন ফিরে আসতে। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে আদালতেরও শরণাপন্ন হয়েছেন বলেও জানা গেছে। অন্যদিকে বরখাস্ত প্রধান শিক্ষক যাতে পুনরায় ফিরে না আসতে পারেন সে লক্ষ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাহমিনা আক্তারের জোর লবিংয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিক্ষক উত্তম বেপারী, সুধা রানী মণ্ডল, তৌহিদ, নাসির উদ্দিন, মিত্রা রানী ও মাহফুজা খাতুন।

সূত্রের দাবি, স্কুলের তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দুই হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সেশন চার্জ, বেতন, পরীক্ষার ফি, জরিমানা, খেলাধুলা, মিলাদ, গার্লস গাইড, স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট ও বিজ্ঞানাগারসহ বিভিন্ন ফি বাবদ বছরে দেড় কোটি টাকা আয় হয়। অন্যদিকে ৪৩ জন শিক্ষক ও ১০ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মাসিক বেতন, ঈদ বোনাস, বৈশাখী বোনাসসহ অন্যান্য ব্যয় বাবদ বছরে ৯৬ লাখ টাকা খরচ হয়। বাকি অর্থ দিয়ে স্কুলের উন্নয়নমূলক কাজ করার কথা থাকলেও সেই অর্থ ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্কুলের নামে ট্রাস্ট ব্যাংক, কেরানীগঞ্জ শাখায় থাকা হিসাব নম্বর পরিচালনাতেও কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়ে থাকে। সরকারি বিধি অনুযায়ী এক লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয় না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৩ সালে নানা অভিযোগে প্রধান শিক্ষক আবু রায়হানকে বরখাস্ত করা হয়। নারী সহকর্মীদের প্রতি অশালীন আচরণ, আর্থিক দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা, ভবন তৈরির ইট, বালু, সিমেন্ট বিক্রি, ব্যাংকের সিলমোহর জাল করে টাকা আত্মসাৎ, শিক্ষিকাদের রুমে গোপন ক্যামেরা বসানো, শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করতে ঘুস গ্রহণ, ফরম ফিলাপের টাকা আত্মসাৎ, সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য করে বই বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধে তিনি তিনবার বরখাস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঁচ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এরপর থেকে স্কুলটিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তাহমিনা আক্তারের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে বিধিবহির্ভূতভাবে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করছেন এবং কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই লাখ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন ও উন্নয়ন কাজ করাচ্ছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তাহমিনা আক্তার বলেন, টেন্ডার ছাড়া বিদ্যালয়ের কোনো কাজ করা হয়নি। বিদ্যালয়ের তহবিলে কত অর্থ রয়েছে এবং কী কী খাতে ব্যয় হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা বলতে রাজি হননি। স্কুল পরিচালনা কমিটির বাইরে তিনি কাউকে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখাবেন না বলে তিনি ফোন রেখে দেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন