১০ মিনিটের পথে সময় লাগে এক-দেড় ঘণ্টা

যানজটে দিনে স্থবির ঢাকা, নিস্তার নেই রাতেও

যানজটে দিনে স্থবির ঢাকা, নিস্তার নেই রাতেও
ছবি: আমার দেশ

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থেকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। যথাসময়ে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন কর্মজীবী মানুষ এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

গত কয়েক দিন ধরেই রাজধানীতে যানজটের তীব্রতা বাড়ছে। এমনকি গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া যানজটের প্রভাব গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত দেখা যায়। রাজধানীর প্রায় সব প্রবেশমুখেই ছিল যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সামান্য পথ পাড়ি দিতে অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কের খানাখন্দ, জলাবদ্ধতা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগও যানজটের বিভিন্ন কারণের কথা জানিয়েছে।

রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মতো গতকাল সকাল থেকেই কাকরাইল মসজিদ থেকে মগবাজার চৌরাস্তা পর্যন্ত তীব্র যানজট ছিল। কাকরাইল মসজিদের সামনে থেকে মগবাজার ফ্লাইওভারে উঠতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এটি মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ।

ভুক্তভোগী জান্নাতে নাইম (২৮) কাকরাইলে জাতিসংঘভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকল্পে কাজ করেন। মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করেও যানজট এড়াতে পারেননি তিনি। নাইম বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যে পথ যেতে পাঁচ-সাত মিনিট লাগে, যানজটের কারণে সেখানে সময় লেগেছে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। মোটরসাইকেল চালিয়েও যানজট থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না।

যেসব এলাকায় তীব্র যানজট

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, মিন্টো রোড, রমনার বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি, কাকরাইল, মৎস্য ভবন, প্রেস ক্লাব, নাইটিঙ্গেল মোড়, মগবাজার, তেজগাঁও, সাতরাস্তা, মিরপুর, আগারগাঁও, উড়োজাহাজ ক্রসিং ও বিজয় সরণি সিগন্যালসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তীব্র যানজট, কোথাওবা গাড়ির ভারী চাপ।

বিভিন্ন ট্রাফিক সিগন্যালে একাধিক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেলেও যানচলাচলে স্বাভাবিক গতি ফেরেনি। যানজটে আটকে থাকা অনেক যাত্রীকে বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের দিকে যেতে দেখা গেছে।

রমনা ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বলেন, কাকরাইল মসজিদ থেকে মগবাজার চৌরাস্তা পর্যন্ত মঙ্গলবারের তীব্র যানজটের অন্যতম কারণ ছিল তেজগাঁও এলাকার পরিস্থিতি। মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে তেজগাঁওমুখী যানবাহন ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। তবে রমনা এলাকায় বড় কোনো সমস্যা ছিল না বলে জানান তিনি।

তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সোমবারের বৃষ্টির পর যানবাহনগুলো স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারেনি। পাশাপাশি পথচারীরা বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেওয়া এবং সড়কের কিছু অংশে পানি জমে থাকায় সিগন্যালগুলোয় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা বৃষ্টিতে ভিজেও সড়ক সচল রাখার চেষ্টা করেন।

খানাখন্দ ও জলাবদ্ধতায় বেড়েছে ভোগান্তি

গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে সড়কের খানাখন্দ যুক্ত হওয়ায় যান চলাচল আরো ব্যাহত হয়েছে। বৃষ্টির পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এর প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।

কারওরান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল, ধানমন্ডি ও মিরপুর রোড ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির পরপরই প্রধান সড়কগুলোয় যানবাহনের গতি কমে যায়। নিচু এলাকার বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় যানচলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।

মার্কেট বন্ধ, তবু যানজট

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানায়, মঙ্গলবার কাঁঠালবাগান, হাতিরপুল, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, রাজাবাজার, মনিপুরীপাড়া, তেজকুনিপাড়া, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, নীলক্ষেত, কাঁটাবন, এলিফ্যান্ট রোড, শুক্রাবাদ, সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, জিগাতলা, রায়েরবাজার, পিলখানা ও লালমাটিয়া এলাকার বিভিন্ন মার্কেট বন্ধ থাকলেও এসব এলাকায় যানজট ছিল।

যানজট নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও বাস্তব চিত্রে তেমন স্বস্তি মেলেনি। যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, আনসারসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সদস্যদেরও হিমশিম খেতে হয়েছে। বিশেষ করে স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও ছুটির সময় যানজট আরো তীব্র হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের সুযোগে সিএনজি, রিকশা ও বাসের ভাড়াও কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন যাত্রীরা।

প্রতিদিন হারাচ্ছে কর্মঘণ্টা

রাজধানীর প্রতিদিনের যানজট নগরবাসীর ক্ষোভ, বিরক্তি ও দৈনন্দিন দুর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। যানজটের কারণে অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা হাসপাতালে সময়মতো পৌঁছানো ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন সড়কে আটকে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বড়।

রাজধানীতে প্রবেশের চারটি প্রধান পথেও প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। কর্মস্থল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে কাটাতে হচ্ছে। কখনো কখনো এসব যানজট নগরীর সীমানা পেরিয়ে ১০-১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকে পড়লে। জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় পরিস্থিতি কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে পরিণত হয়।

উল্টা পথে অটোরিকশায় বাড়ছে ঝুঁকি

রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে এসব অটোরিকশার উল্টা পথে চলাচল শুধু যানজট বাড়াচ্ছে না, সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, রাজধানীর সড়কের অনেকটাই অটোরিকশার দখলে চলে গেছে। শুধু বেকারত্ব নয়, অল্প পরিশ্রমে তুলনামূলক বেশি আয়ের আশায় লাখ লাখ মানুষ রাজধানীতে অটোরিকশা নিয়ে নামছেন।

তিনি বলেন, রাজধানীতে এসে অটোরিকশা চালানোর সুযোগ সীমিত করতে হবে। অটোরিকশার দৌরাত্ম্য কমাতে হলে এর উন্নত বিকল্প মানুষের সামনে হাজির করতে হবে। এতে নগরবাসী অটোরিকশা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবেন এবং যাত্রীর অভাবে অটোরিকশাচালকরা গ্রাম বা মফস্বল শহরে ফিরে অন্যান্য কাজে যুক্ত হতে পারেন। এজন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থান গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ১৯০৮ মামলা

এদিকে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১,৯০৮টি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।

গত সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব মামলা করা হয়। মঙ্গলবার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন