আইআইইউসির ওরিয়েন্টেশনে সাবেক রাবি ভিসি ড. নাকিব

নৈতিকতা-বর্জিত জ্ঞান বিপজ্জনক হয়ে ওঠে

নৈতিকতা-বর্জিত জ্ঞান বিপজ্জনক হয়ে ওঠে
বক্তব্য রাখেন সাবেক রাবি ভিসি ড. নাকিব। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর বিশিষ্ট পদার্থ-বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নাকিব বলেছেন, নৈতিকতা-বর্জিত জ্ঞান বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সততা ও নিষ্ঠাবিহীন বুদ্ধিমত্তা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনই দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের ভিত্তি। প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকিব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন যেমন অগণিত সুযোগের দ্বার উন্মোচন করে, তেমনি এতে অনেক বিভ্রান্তি ও মনোযোগ বিচ্যুতিরও সুযোগ থাকে। নবীন শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের সঙ্গে আধ্যাত্মিক বিকাশের সমন্বয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিনয়ের ভারসাম্য, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শৃঙ্খলা এবং প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে নৈতিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় করতে হবে। আধুনিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং একই সঙ্গে নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। ঠিক এখানেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনন্য ও অমূল্য।

বিজ্ঞাপন

গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর ২০২৬ সালের শরৎকালীন সেমিস্টারে ভর্তি হওয়া নবীন ছাত্রীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকিব একথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইআইইউসির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস-চেয়ারম্যান মো. মুহাম্মদ শাহজাহান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইআইইউসির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ হাসমত আলী। ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ও আয়োজক কমিটির কো-কনভেনার প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, রেজিস্ট্রার কর্নেল মো. কাসেম, পিএসসি (অব.), কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কাওসার আহমেদ, ফিমেল একাডেমিক জোনের প্রধান মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা এবং ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের এসোসিয়েট প্রফেসর ও সহকারী প্রক্টর সুলতানা আক্তার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নাকিব বলেন, শৃঙ্খলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে একজন কতটুকু সফল হবেন, তা তার মেধার ওপর যতটা নির্ভর করবে, তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করবে তিনি জীবনে একটি নির্দিষ্ট ধরনের শৃঙ্খলা কতটুকু ধারণ করতে পারছেন, তার ওপর। তিনি বলেন, জাতি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তাসুলভ মানসিকতা এবং মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই এখন আমাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে ভালো ও মন্দ-উভয় ধরনের ধারণার একটি দ্বন্দ্ব আজ আমাদের সমাজকে বহু ভাগে বিভক্ত করেছে। এটি শুধু বাংলাদেশের সমাজের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। পৃথিবীর কোনো প্রান্তের কোনো সমাজই আজ পুরোপুরি শান্ত নয়। নানা ধরনের ধ্যান-ধারণা সমাজে নানা ধরনের বিভক্তির সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, আমরা মানব ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর, একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং সময়ে বাস করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বায়োটেকনোলজি ও ডেটা সায়েন্স আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে আমূল বদলে দিচ্ছে। আমাদের চোখের সামনেই সবকিছু পরিবর্তিত হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রযুক্তির অতি দ্রুত পরিবর্তন সত্ত্বেও মানবতাকে পথ দেখানোর মৌলিক মূল্যবোধগুলো চিরন্তন, এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের যে আদি প্রকৃতি বা ফিতরাত, আমাদের যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে কিছু মূল সত্তা রয়েছে, যেগুলো হাজার বছর ধরে একই রকম। মৌলিক মূল্যবোধের প্রশ্নে বড় ধরনের পরিবর্তন সমাজে অনেক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এমন অনেক পেশা আছে, যেগুলো আগামী দুই দশকের মধ্যে অনেকটা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আবার এমন অনেক নতুন পেশার সৃষ্টি হবে, যেগুলো সম্পর্কে এখনো আমরা ধারণা করতে পারছি না।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান মো. মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের হাতে একটি সার্টিফিকেট তুলে দিয়ে এই ক্যাম্পাস থেকে তোমাদেরকে বিদায় দিতে চাই না। আমরা তাদেরকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করে একজন গবেষক হিসেবে পেতে চাই, উদ্যোক্তা হিসেবে পেতে চাই, মডেল শিক্ষক হিসেবে পেতে চাই, সর্বোপরি আমরা তাদেরকে যার যার অঙ্গনে লিডার হিসেবে পেতে চাই। এইভাবে তারা নিজেদের জীবনকে জাতির জন্য, উম্মাহর জন্য, দেশের জন্য ে গড়ে তুলবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তা আশা করি। তিনি বলেন, আধুনিকতা এবং ইসলাম, এটি আমাদেরকে যথার্থভাবে অনুধাবন করতে হবে। আমরা নিজেদেরকে মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব, ভদ্র মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব, পরোপকারী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব, আমরা স্মার্ট হব। আমাদের প্রতি সমাজ তাকিয়ে আছে। এই সমাজকে দেয়ার জন্য যা অর্জন করা দরকার, সেটা আমরা অর্জন করবার জন্য চেষ্টা করব।

সভাপতির বক্তব্যে আইআইইউসির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, বিজ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে আল্লাহর সৃষ্টি কাজ করে, আর ঈমান শেখায় কেন তা সৃষ্টি হয়েছে। একজন মুসলিম প্রকৌশলী যখন টেকসই অবকাঠামো তৈরি করেন, তা ইবাদত। তাই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষও একটি ইবাদতের স্থান। তিনি বলেন, সভ্যতার সূচনা জ্ঞান দিয়ে। জ্ঞান ছাড়া সভ্যতার সূচনা হয় না। এ জন্য আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, যাকে হেকমত বা জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাকে অশেষ কল্যাণ দান করা হয়েছে। আজকের বিশ্বসভ্যতার দিকে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম বিশ্ব সম্পদে খুব ধনী, কিন্তু কৌশলে ধনী নয়। আজকে যারা কৌশলে ধনী, তারাই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর আমরা চুপ করে তাকিয়ে আছি—কখন ওপর থেকে বোমা পড়ে, কখন কী হয়, কে কী করে—এসব নিয়ে আতঙ্কিত। কারণ আমরা কৌশলবিহীন। তিনি বলেন, আল্লাহ আমাদের বলেছেন, তোমরা হেকমত অর্জন করো, কৌশল অর্জন করো। কৌশল ছাড়া তোমরা টিকে থাকতে পারবে না।

অনুষ্ঠানের নবীন ছাত্রীদের শপথ পাঠ করান আইআইইউসির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অংশে অনুষ্ঠিত হয় বিভাগীয় ব্রিফিং সেশন। এতে ডিভিশন ও অফিসের কার্যক্রম সম্পর্কে নবীন ছাত্রীদের অবহিত করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে আইআইইউসির ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ভর্তি পরীক্ষায় নিজ নিজ অনুষদে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত নবীন ছাত্রী প্রতিনিধিদের ফুলেল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দিনের শেষ আয়োজনে বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে নবীন ছাত্রীরা অংশ নেন।-সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন