সাক্ষীদের জবানবন্দি

হাঁটুতে গুলি করে বালি ঢুকিয়ে দেয় পুলিশ, পা কেটে ফেলতে হয় দুই শিবির নেতার

স্টাফ রিপোর্টার

হাঁটুতে গুলি করে বালি ঢুকিয়ে দেয় পুলিশ, পা কেটে ফেলতে হয় দুই শিবির নেতার

যশোরের চৌগাছায় ২০১৬ সালে গ্রেপ্তারে পর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করে পঙ্গু করার ঘটনায় সাবেক এসপি আনিসুর রহমানসহ ৮ আসামির বিচার শুরু হয়েছে।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল- ১ এ প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য ‍দিয়ে এই মামলার বিচার শুরু হয়। এদিন মামলার প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি জবানবন্দি দেন ভুক্তভোগী ইসরাফিল হোসেন।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমার বয়স ২৯ বছর। আমি যশোর শহরে ইবনে সিনা হাসপাতালে পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসাবে কর্মরত আছি। ২০১৪ সাল থেকে আমি আওয়ামী লীগ সরকার বিরুদ্ধে নানা ইস্যুতে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। তখন আমি ইসলামী ছাত্রশিবির চৌগাছা থানার সেক্রেটারি ছিলাম। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অনেকবার আমার বাসায় হামলা করেছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমার বাড়ীতে গিয়ে কয়েকবার আমাকে না পেয়ে আমার পরিবারের লোকজনের কাছে আমাকে ওম ও ক্রসফায়ার করে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরের পরে আমি ও আমার বন্ধু রুহুল আমিন সাংগঠনিক কাজ শেষে মোটরসাইকেলে করে যশোর শহর থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। রুহুল আমিন চৌগাছা থানার সাহিত্য সম্পাদক ছিলো। তখন আমি যশোর সরকারি এম. এম কলেজরে অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলাম এবং রুহুল আমিন একই কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলো। আনুমানিক সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার সময় চৌগাছা থানার বন্দলীতলা গ্রামের শফি মল্লিকের ইটের ভাটার কাছে পৌঁছালে আগে থেকে ওঁতপেতে থাকা চৌগাছা থানার পুলিশ আমাদের থামায়। তারা আমাদেরকে দেখে চিনতে পারে এবং বলে তোদেরকে অনেকদিন থেকে খুঁজছি। তারা আমাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করে বাইতুল মাল আদায়ের একটি রশিদ বই ও দলীয় কয়েকটি বই পায়। তারা আমাদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

জবানবন্দিতে ইসরাফিল বলেন, আমাদেরকে যারা আটক করেছিলো তাদের মধ্যে এসআই মোকলেস, এএসআই মাজেদ ও এএসআই সিরাজুল ইসলামকে আমি চিনতে পারি। দুইজন কনস্টেবল ছিলো তাদেরকে আমি পরবর্তীতে চিনতে পারি। থানায় নিয়ে রাত ১১টার পর ওসি মশিউর রহমানের রুমে নিয়ে চর, থাপ্পর, কিল-ঘুষি এবং বুট দিয়ে লাথি ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমরা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। জ্ঞান ফিরলে ওসি মশিউর ভিডিও কলে এসপি আনিসুর রহমানকে আমাদেরকে দেখিয়ে বলে স্যার আপনার নির্দেশনামতে এই দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তখন এসপি আনিসুর বলে সকালে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। পরবর্তীতে আমার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবা। নির্যাতনের একপর্যায়ে এসআই আকিকুল ওসিকে বলে, স্যার এদের ব্রেনওয়াশ করা, এরা কিছু বলবে না। এদেরকে গুলি করে দেন। সরকার বিরোধী আন্দোলনে কারা কারা জড়িত তা জানতে চেয়েছিলো সে। পরে এসআই আকিকুলের নেতৃত্বে যশোর ডিবি অফিসে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডিবির একজন সদস্য আমাদের বলেছিলো এসপির নির্দেশ আছে রাতে তোদেরকে ক্রসফায়ার দেওয়ার।

পা হারানো এই ভুক্তভোগী জবানবন্দিতে আরো বলেন, ৪ আগস্ট সন্ধ্যার পরে এসআই আকিকের নেতৃত্বে ডিবি অফিস থেকে আমাদেরকে নিয়ে চৌগাছা থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথিমধ্যে আনুমানিক রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমাদেরকে হাতে হ্যান্ডকাপ ও চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়। সেখানে থেকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমরা গুলির শব্দ পাই। তখন একজন বলে ফায়ার অফ। কন্ঠ শুনে আমি বুঝতে পারি তিনি ছিলেন ওসি মশিউর। আমি ভাবলাম আমাদের গুলি করা হবে না। এর অল্প কিছুক্ষণপর ওসি মশিউর বললেন সাজ্জাদ, জহুরুল ‘ফায়ার’। সঙ্গে সঙ্গে একটি বিকট শব্দ হয়। আমার বন্ধু রুহুল আমিন ও মাগো বলে চিৎকার করে উঠে। তখন আমি বুঝতে পারি তাকে গুলি করা হয়েছে। এর অল্প কিছুক্ষণপর আমি বাম পায়ের হাটুতে বন্দুকের স্পর্শ পাই , বিকট শব্দে আমার পায়ে গুলিবিদ্ধ হয় (এ সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।) এরপর আমার হাতের হ্যান্ডকাফ এবং চোখের বাঁধন খুলে দেয়। তারা গুলির স্থানে ক্ষতস্থানে ধুলাবালি দিয়ে গামছা বেঁধে দেয়। আমি চোখ খুলে দেখি আমার বন্ধু পাশে পড়ে আছে। তার পায়েও গুলি করা হয়েছে। আমি সেখানে ওসি মশিউর, এসআই আকিক, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল জহুরুল এবং সাজ্জাদকে দেখতে পাই। পরে আমাদের যশোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুইদিন বিনা চিকিৎসায় রাখা হয়। আমাদের ক্ষতস্থানে বালু দেওয়ার কারণে ইনফেকশন হলে সেখান থেকে আমাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। পঙ্গু হাসপাতালে ১৫ দিন চিকিৎসার পর পায়ে পচন ধরে যায়। ফলে আমার বাম পা হাটুর উপর থেকে কেটে ফেলা হয় (এ সময় সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে তার বাম পা দেখান যা হাটুর উপর থেকে বিচ্ছিন্ন)। সেখানে আমরা পুলিশ পাহারায় প্রায় দেড় মাস চিকিৎসা গ্রহণ করি। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে আমাদের ছাড়পত্র দেওয়া হলে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আমাদেরকে কোর্টে প্রেরণ করে। সেখান থেকে আমাদেরকে জেলখানায় পাঠানো হয়। আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশ অস্ত্র আইনে একটি এবং বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে একটি, মোট দুইটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে। ৩৩ দিন পর আমরা জামিনে মুক্ত হই। জেলখানায় আমরা এরকম অসংখ্য লোককে দেখতে পাই যাদেরকে আমাদের মতোই পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। এদের মধ্যে যশোর শহরের আল-মুসাইব এবং সোলাইমানকে চিনতাম। আমি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন