প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে মডেল ও অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীর নারাজি আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
রোববার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দেন।
এ দিন আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী নারাজি আবেদন দাখিল করেন এবং পরে আদালতে সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন এবং আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় নির্ধারণ করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদী নারাজির দরখাস্ত দাখিল করেছিলেন। বিচারক নারাজির বিষয়বস্তু শুনে এবং সাক্ষীদের পরীক্ষা করে নারাজি আবেদন মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত বছর (২০২৫ সালের) ১০ মে পিবিআই এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিল।
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বাদী পেশায় একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং তাঁর গুলশানের ১২৭ নম্বর রোডে একটি ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে। অন্যদিকে তানজিন তিশা একজন মডেল ও অভিনেত্রী। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নেওয়ার সূত্রে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর তানজিন তিশা একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তাঁর সাবেক ড্রাইভারের মাধ্যমে বাদীর কাছ থেকে একটি শাড়ি নেন। বাদীপক্ষের দাবি, শাড়িটির মূল্য ছিল ৭৫ হাজার টাকা এবং অনুষ্ঠান শেষে পরদিনই সেটি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। তবে শাড়িটি নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দেওয়া হয়নি বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়।
তদন্তে জানা যায়, শাড়িটি ফেরত চেয়ে বাদী ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান। তবে উভয় পক্ষের মেসেঞ্জার স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, তিশা ওই বার্তাগুলো ‘সিন’ করেননি; কারণ তিনি ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ফেসবুক মেসেঞ্জার ব্যবহার করতেন না। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বাদী তিশাকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানান এবং ১৮ মে একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখা ও কুশল বিনিময় হয়। এরপর থেকে ফ্যাশন হাউজের ট্রায়াল রুম ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে দুই জনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও মনোমালিন্য তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাদী আবার তিশাকে মেসেঞ্জারে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার জন্য তাগিদ দেন। সেখানে প্রায় এক বছর ধরে শাড়িটি ফেরত না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে লোক পাঠিয়ে তা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। জবাবে তিশা শাড়িটির বিষয়ে জানতে চাইলে বাদী ছবি পাঠান। পরবর্তী কথোপকথনে তিশা শাড়িটির বিষয়টি তৎক্ষণাৎ মনে করতে পারছেন না এবং খুঁজে দেখে তা জানিয়ে দেবেন বলে জানান।
তিশা জানান, তাঁর সাবেক ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেননি এবং ওই ড্রাইভার পরে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পরবর্তীতে ৭ নভেম্বর বাদী তিশাকে মেসেঞ্জারে ইংরেজিতে বার্তা পাঠিয়ে আগের বার্তাগুলো দেখতে এবং শাড়িটি ফেরত দিতে বলেন। একই সঙ্গে হুমকি না দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
এর জবাবে ১০ নভেম্বর তিশা মেসেঞ্জারে বাদীকে ব্যক্তিগত সমস্যা ও পেশাগত বিষয় আলাদা রাখার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি তাদের একসময়ের ভালো সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানান যে, শাড়ির বিষয়ে তাঁর লোকজন ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাদীর লোকজন যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বার্তার পর বাদী ১২ নভেম্বর গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিশা গুলশান থানা পুলিশের মাধ্যমে শাড়িটি ফেরত দিতে চাইলেও বাদী তা গ্রহণ না করে আদালতে মামলা করেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালে তানজিন তিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, বাদীর সঙ্গে তাঁর একসময় ভালো সম্পর্ক ছিল এবং এর আগেও বাদীর কাছ থেকে আরও শাড়ি নিয়ে পরার পর তিনি সেগুলো ফেরত দিয়েছেন। এসব শাড়ির বিনিময়ে তিনি কোনো পারিশ্রমিক বা অর্থ নেননি।
দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কথা না হওয়ায় তিনি শাড়িটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন বলে জানান তিশা। তাঁর সাবেক ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চলে যাওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে বাদীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ঠিকানা পাওয়া যায়নি বলে তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান।
মামলার বিষয়টি জানার পর তিশা ডাকযোগেই শাড়িটি ফেরত পাঠান। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তিনি শাড়িটি ডাকযোগে বাদীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাদীকে নোটিশ দিয়ে এবং তদন্তকালে সরাসরি ও মোবাইল ফোনে মামলার অভিযোগের সপক্ষে দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। অন্যদিকে বিবাদী তিশা শাড়িটি ফেরত দিয়েছেন। ফলে শাড়ি নিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
হুমকির অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তিশার পাঠানো বার্তার শেষাংশে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা চাওয়া এবং বাদীর সুন্দর জীবন কামনা করা হয়েছিল। ফলে ওই বার্তার মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার কোনো অপরাধও প্রমাণিত হয়নি।
সবশেষে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, বাদী ও বিবাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বাদীর আনীত অভিযোগের সপক্ষে কোনো আইনি ভিত্তি বা অপরাধের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে আদালত এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীর নারাজি গ্রহণ করে মামলাটি সিআইডিকে দিয়ে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


