চলতি মাসেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের নতুন চার মামলার বিচার। এর মধ্যে জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফারহান ফাইয়াজসহ নয়জনকে হত্যা এবং বাড্ডা এলাকায় ২৩ জনকে হত্যার মামলা রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বরিশালে ক্রসফায়ারে দুজনকে হত্যা এবং যশোরে দুই শিবির নেতাকে পঙ্গু করার মামলা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনটি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এ একটি মামলার বিচার শুরু হবে। ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে অপর দুই সদস্য হলেনÑবিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির।
চার মামলায় গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের মধ্যে রয়েছেÑ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নুর তাপস, সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও হাসিনার ফুপাতো ভাই সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। এসব মামলায় মোট আসামি ৪২ জন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, এই মাসেই নতুন চার মামলার বিচার শুরু হচ্ছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব বিবেচনায় এই মামলাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে। এরপর অভিযোগ গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ শুনানি শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধ অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাদের বিরদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে। আমরা বিচারের সময় আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে সক্ষম হব।
মোহাম্মদপুরে ফাইয়াজসহ ৯ জনকে হত্যার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা
জুলাই বিপ্লবে মোহাম্মদপুরে ফারহান ফাইয়াজ ও মাহমুদুল রহমান সৈকতসহ নয়জনকে হত্যার ঘটনায় ডিএসসিসির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। গত ১০ মে আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এই মামলায় প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য আজ ১৫ জুন দিন ধার্য রয়েছে।
মামলায় তাপস-নানক ছাড়া আসামিদের মধ্যে অন্যতম ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২৮ নেতাকর্মী।
এ মামলায় চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেনÑনিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। গত ১৮ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।
বাড্ডায় ২৩ জনকে হত্যার বিরুদ্ধে মামলা
জুলাই বিপ্লবে বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যাসহ সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
গত ৩০ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেয়। আগামী ১৭ জুন এই মামলার সূচনা উপস্থাপন এবং প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য দিন ধার্য রয়েছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২৩ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে দুই আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর মামলার দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এখন বিচার শুরুর জন্য অপেক্ষমাণ।
যশোরে দুই শিবির নেতাকে পঙ্গুর মামলা
যশোরের চৌগাছায় ২০১৬ সালে গ্রেপ্তারের পর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করে পঙ্গু করার ঘটনায় তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। গত ২০ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেয়। এই মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
এই মামলায় তিন আসামি গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেনÑচৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহিরুল হক। আনিসুর ছাড়া পলাতক অপর আসামিরা হলেনÑচৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট চৌগাছায় রুহুল আমিন ও ইসরাফিল নামের দুই ছাত্রনেতাকে মিথ্যা মামলায় আটক করে পুলিশ। কিন্তু আদালতে না তুলে পরপর দুই রাত তাদের নির্যাতন করা হয়। এরপর অধস্তন পুলিশদের দিয়ে দুজনের পায়ে গুলি করান তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান। এছাড়া ক্ষতস্থানে বালু ঢুকিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে মিথ্যা মামলায় চালান দেওয়া হয় দুজনকে। ভুক্তভোগীদের পায়ে বালু ঢোকানোর কারণে তাতে পচন ধরে। ফলে পরে তাদের পা কেটে ফেলতে হয়।
বরিশালে দুজনকে ক্রসফায়ারে হত্যার মামলা
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দুজনকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহসহ চারজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। গত ২০ মে ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেয়। আগামী ১৭ জুন এই মামলার সূচনা বক্তব্য এবং প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার দুজন হলেনÑআগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
এই মামলায় চার আসামির মধ্যে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক এসপি এ কে এম এহসানউল্লাহ পলাতক রয়েছেন। গ্রেপ্তার রয়েছেন দুজন। তারা হলেনÑউজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন ।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মামলার ভিকটিম টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি বরিশালে তৎকালীন পুলিশ সুপার একেএম এহসানউল্লাহকে নির্দেশ দেন। এরপর একটি মিথ্যা মামলায় দুই ভিকটিমকে আসামি করা হয়। পরে ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এএসআই মাহবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনকে দিয়ে আগৈলঝাড়া থানার গৌরনদী-গোপালগঞ্জ হাইওয়ের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের বড় ব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বে বুধার নামে স্থানে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


