ছাত্রদলের তিন নেতাকর্মীর ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিল

ছাত্রদলের তিন নেতাকর্মীর ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিল
আমার দেশ গ্রাফিক্স

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের তিন নেতাকর্মী ও শহীদ জিয়াউর রহমান হলের জিএসের ছাত্রত্ব সাময়িকভাবে বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। তবে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে দুজনের নিয়মিত ছাত্রত্ব নেই বলে জানা গেছে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম। এর আগে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা পড়ে।

বিজ্ঞাপন

একই ঘটনায় রাকসুর সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রমাণাদি অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রদলের আরো তিন নেতাকে সতর্ক করার সুপারিশ করেছে কমিটি।

উপাচার্য জানান, গত ৪ অক্টোবর রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও দায়ীদের শাস্তির সুপারিশ করতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ছাত্রত্ব সাময়িকভাবে বাতিলের তালিকায় রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, ছাত্রদলকর্মী বিশাল চক্রবর্তী এবং শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম।

এছাড়া রাকসুর সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম, রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম ও ছাত্রদলকর্মী তানিম রহমানের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ এবং বিভিন্ন প্রমাণ অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি বুলবুল রহমান, সহসভাপতি শরীফুল ইসলাম ও সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমকে সতর্ক করার সুপারিশও করেছে কমিটি।

উপাচার্য বলেন, তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে অপরাধের ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্ত তিনটি আমরা পরবর্তী সিন্ডিকেটে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

দুজনের নেই নিয়মিত ছাত্রত্ব

ছাত্রত্ব সাময়িকভাবে বাতিলের সুপারিশ পাওয়া আহসান হাবীব আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি।

২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কয়েক বছর আগেই তার পড়াশোনা শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে ছাত্রদল থেকেও তাকে তিনবার বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তালিকায় থাকা বিশাল চক্রবর্তী অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি বেরিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগের তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহিল গালিবের সঙ্গে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে।

অন্যদিকে, ছাত্রত্ব বাতিলের সুপারিশ পাওয়া হাসিবুল ইসলাম ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এর আগে চাঁদাবাজির অভিযোগেও তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটিতেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

হাসিবুলের শিক্ষাবর্ষ ২০১৭-১৮ হলেও তিনি বর্তমানে ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন বলে জানা গেছে। জুলাই বিপ্লবের আগে রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দি থাকায় তার পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছিল। পরে তাকে আবার ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়।

ফেসবুক পোস্টের জেরে জিএসের বিরুদ্ধেও সুপারিশ

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের পাশাপাশি হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামের ছাত্রত্বও সাময়িকভাবে বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এ সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সুপারিশের পর নিজের ফেসবুক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরিফুল। তার দাবি, ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। তাকে না পেয়ে তার কক্ষ ভাঙচুর করা হয় এবং সাংবাদিকদের মারধর করা হয়।

নিজের পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ফেসবুকে একটা পোস্ট করাই ছিল আমার অপরাধ!’ হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি আরো দাবি করেন, সেদিন হামলাকারীরা তাকে পেলে তার জীবনও বিপন্ন হতে পারত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন তিনি।

ফেসবুক পোস্ট ঘিরে উত্তেজনা, পরে হামলা

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, গত ২ অক্টোবর রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে ফেসবুকে আক্রমণাত্মক পোস্ট দেন ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সহসভাপতি আহসান হাবীব। এ নিয়ে রাকসুর সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে উভয়পক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্ট দেয়।

পরদিন ৩ অক্টোবর রাকিবুল সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটের সামনে অবস্থান করেন। বিকাল ৫টা ৫৪ মিনিটে সেখানে অবস্থান নেন আহসান হাবীব। রাত ১০টা পর্যন্ত অবস্থান করার ঘোষণা দিয়ে তিনি ফেসবুকে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে উদ্দেশ করে আক্রমণাত্মক ভাষায় পোস্ট দেন।

এর জেরে হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামও পাল্টা পোস্ট দেন। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে হল সংসদের জিএসের কক্ষে ভাঙচুর চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার পর ভিডিও ও সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়। হামলায় রাবি শাখা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সহসভাপতি আহসান হাবীবের নেতৃত্বে যুক্ত ছিলেন বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী।

স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সাংবাদিকদের

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকদের পক্ষে বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে অধিকতর তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং যাদের ছাত্রত্ব নেই, তাদের সনদ বাতিলেরও দাবি জানান তিনি।

গত ৪ অক্টোবর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম কমিটিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...