ফেনী ইউনিভার্সিটির নতুন কমিটিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের শীর্ষ পদে বসানো নিয়ে বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভায় গঠনতন্ত্র অমান্য করে ‘ক্যু’ স্টাইলে এই নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, গত ১২ অক্টোবর বেলা সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কের র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলের বিপরীতে আর্মি গলফ ক্লাবের ‘পাম ভিউ রেস্টুরেন্ট’-এ ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সভার আগে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সাহেদ রেজা ওই রেস্টুরেন্টের একটি কক্ষ নিজের নামে বরাদ্দ নেন। এরপর কোনো পূর্ব নির্ধারিত এজেন্ডা ছাড়াই ফেনীর পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহচর ও ট্রাস্টি মেম্বার আলতাফ হোসেনকে দিয়ে জরুরি সভার কথা বলে সভাপতিসহ অন্য সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সভায় ইউনিভার্সিটির কোষাধ্যক্ষ, ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ ট্রাস্টি বোর্ডের ২১ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৭ জন সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ২১ জন সদস্যের মধ্যে ৩ জন প্রয়াত, ফলে জীবিত ১৮ জনের মধ্যে অর্ধেকেরও কম সদস্য সভায় অংশ নেন।
সরাসরি উপস্থিত সদস্যরা হলেন— আবদুস সাত্তার, ব্রিগেডিয়ার (অব.) নাসির উদ্দীন আহমেদ, নুরুল নওয়াজ সেলিম, সাহেদ রেজা, আকরাম হোসেন হুমায়ুন, আলতাফ হোসেন ও প্রকৌশলী ফারুক। এছাড়া অনলাইনে যুক্ত হয়েছিলেন আবু কায়ছার আহমেদ নামে অপর এক সদস্য।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সাহেদ রেজা সরাসরি ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং আকরাম হোসেন হুমায়ুন সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন। সাধারণ সদস্যদের অভিযোগ, সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অব.) নাসির উদ্দীন আহমেদসহ দুই-একজন ছাড়া উপস্থিত বাকিদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ উঠেছে, ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক সভাপতি ও ফেনী-১ আসনের সাবেক পলাতক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের যোগসাজশে সাহেদ রেজাকে দিয়ে কোনো পূর্ব এজেন্ডা ছাড়াই বৈঠকে আওয়ামী বলয়ের সদস্যদের সংগঠিত করা হয়। সেখানে কৌশলে ‘ক্যু’ করে নতুন কমিটি দখল করে নেয় একটি গোষ্ঠী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাস্টি বোর্ডের একাধিক সদস্য এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন লাভ করে এবং ২০১৩ সালে ফেনী শহরের বারাহিপুরে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য মৃত্যুর আগে জেলার প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী তার পারিবারিক প্রায় ১০-১১ একর জমি নামমাত্র মূল্যে লিখে দেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৪-৫ বছর ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এর অন্যতম উদ্যোক্তা আবদুস সাত্তার। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার ও ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম নিয়মবহির্ভূতভাবে টানা প্রায় ৮ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আলাউদ্দিন নাসিম আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ব্রিগেডিয়ার (অব.) নাসির উদ্দীন আহমেদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
তার নেতৃত্বাধীন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত সময়ের নানা অনিয়ম নজরে আসে। অবৈধ পন্থায় শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগসহ ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হতে যে পরিমাণ অর্থ দেওয়ার কথা, তা না দিয়েই স্বজন ও দলীয় লোকদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ধরা পড়ে।
এসব অনিয়ম যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। নানা অজুহাতে অনুগতদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উস্কে দিয়ে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে রাজধানীতে জরুরি বৈঠকের নামে ট্রাস্টি বোর্ডের ওই সভা ডেকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে আওয়ামী সিন্ডিকেটের সদস্যদের জড়ো করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ হাতানোর চেষ্টা করা হয়।
ঘোষিত নবগঠিত কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে কনকা গ্রুপের মালিক ও আলাউদ্দিন নাসিমের ঘনিষ্ঠ নুরুল নওয়াজ সেলিমকে। আর সিনিয়র সহ-সভাপতি করা হয়েছে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য ড. এ. কে. এম. সাহিদ রেজাকে।
কমিটিতে সহ-সভাপতি হিসেবে আবদুর রইছ কাইজার এবং বিশেষ পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আব্দুস সাত্তারকে। একই সঙ্গে ডা. এ. এস. এম. তবারক উল্যাহ চৌধুরী (বায়োজিদ) ও মো. এনায়েত উল্লাহকে তাদের পূর্বনির্ধারিত দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
এদিকে, বিতর্কিত ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়টির শীর্ষ পদে বসানোকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নুরুল নেওয়াজ সেলিমের অতীতে নৌকার নির্বাচনি সভায় সভাপতিত্ব করা এবং সাহিদ রেজার নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পদ আঁকড়ে রাখার বিষয়টি সামনে এনে অনেকেই তাদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিরা উচ্চশিক্ষার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আসতে পারেন? বোর্ড সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আসীন ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ভূমিকা, পেশাগত যোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রাসঙ্গিক তথ্য ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান ভূঁইয়ার বাবা সাইফুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘বিগত সময়ে দায়িত্ব পালনকালে ফ্যাসিস্টরা যেসব অনিয়ম ও লুটপাট করেছে, তা প্রকাশের ভয়ে তারা আবারও দলীয় লোকদের শীর্ষ পদে বসিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কুক্ষিগত করার পায়তারা করছে। স্বচ্ছতার স্বার্থে দ্রুত এই কমিটি বাতিল করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও জেলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এম. কে. এম. আবদুর রহিম বলেন, ‘কৌশলে ট্রাস্টি বোর্ডের শীর্ষ পদ বাগিয়ে নিয়ে নানা কর্মসূচির আড়ালে আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা মূলত জেলায় নিজেদের পুনর্বাসিত করা এবং শিক্ষার্থীদের সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার পায়তারা করছে। বিতর্কিত এই কমিটি বাতিলসহ পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

