রামেবি উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ১

রামেবি উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ১
রামেবি উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হক। ফাইল ছবি

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে কার্যালয়ে ঢুকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। উপাচার্য়ের পিএস নাজমুল হোসেন এ মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় আবদুস সালাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার সকালে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগে রামেবি উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে কার্যালয়ে ঢুকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ ব্যানারে একটি দল এ ঘটনা ঘটায় বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিএনপি ও যুবদলের ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এ সময় তার মোবাইল ও ল্যাপটপ কেড়ে নেওয়া হয়।

একই সঙ্গে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) নাজমুল হোসাইনকে মারধর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগও উঠেছে। ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি কক্ষে তালা দেওয়া হয়। পাশাপাশি সিসিটিভির সিপিইউ ও হার্ডডিস্ক খুলে নেওয়া এবং বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এতে রামেবির স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী নির্মাণকাজের তথ্য প্রস্তুতের সময় হঠাৎ একদল লোক উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করে।

উপাচার্যের পিএস নাজমুল হোসাইন বলেন, তারা ভিসির সঙ্গে কথা বলতে চান বলে এসেছিলেন। অনুমতি নেওয়ার কথা বললে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তারা উপাচার্যের কক্ষে ঢুকে পড়েন।

নাজমুল অভিযোগ করে বলেন, ভিসিকে চেয়ার থেকে উঠিয়ে আবার বসানো হয়। এরপর আগে থেকে লিখে আনা একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি স্বাক্ষর করতে না চাইলে তারা স্বাক্ষর করতে চাপ দেন। পরে আমাকেও একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। আমি অস্বীকৃতি জানালে তারা আমাকে মেরে কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করি।

উপাচার্য জাওয়াদুল হক জানান, গতকাল ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল তার কার্যালয়ে ঢুকে অশালীন আচরণ করে। পরে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয়। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করেন তিনি।

তিনি বলেন, কাগজে কী লেখা ছিল, তা পড়ার সুযোগ পাননি। শুধু প্রথম বাক্যে ‘পদত্যাগপত্র’ শব্দটি দেখতে পেয়েছেন। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়।

উপাচার্যের দাবি, হামলাকারীরা স্থানীয়দের বাদ দিয়ে ঢাকার লোকজনকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ তুলে। তবে এ ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীরা জড়িত কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।

ঘটনার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছে বলে জানান উপাচার্য। গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব অভিযোগ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মোফাক্করুল ইসলাম বলেন, নির্মাণকাজের তথ্য প্রস্তুতের সময় হঠাৎ একদল লোক কার্যালয়ে প্রবেশ করে। তারা উপাচার্যের মোবাইল ও ল্যাপটপ নিয়ে নেয়। পরে একটি পদত্যাগপত্রে তাৎক্ষণিক স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেয়। উপাচার্য দেখতে চাইলে তাকে তা করতে দেওয়া হয়নি।

ডেপুটি রেজিস্ট্রার আরো বলেন, পরে তারা নিজেদের তালা দিয়ে কয়েকটি কক্ষ বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সহসভাপতি নজরুল হুদার ইন্ধনে এর আগে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে কয়েক দফা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজে স্থানীয়দের বাদ দিয়ে ঢাকার লোকজনকে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ওই পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচি করা হয়।

এ ব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি নজরুল হুদা বলেন, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের জেরে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়ে গিয়ে উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা তিনি জানেন না।

রাজশাহী মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনি বলেন, যুবদলের নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে জানানো হলেও, তা সঠিক নয়। কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তার জানা নেই।

এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে রাজপাড়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। রাজপাড়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে দেখতে পায়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, উপাচার্যের বিরুদ্ধে কারো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশাসনিক কার্যালয়ে ঢুকে কোনো কর্মকর্তাকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা, দাপ্তরিক সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ গুরুতর।

ঘটনার পর মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত রামেবির স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, চলমান নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যালয়ে ঢুকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করল, তাদের হাতে আগে থেকে প্রস্তুত পদত্যাগপত্র কীভাবে গেল এবং সিসিটিভির হার্ডডিস্কসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন