বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বুয়েট’ নামে সমধিক পরিচিত। এটি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কারিগরি-সম্পর্কিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যা ঢাকার লালবাগ থানার পলাশী এলাকায় অবস্থিত। কারিগরি শিক্ষা প্রসারের জন্য ১৮৭৬ সালে ঢাকা সার্ভে স্কুল নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি পরবর্তীতে আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং এ পরিণত করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে এর নাম হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতি বছর শত শত ছাত্র-ছাত্রী এই প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বিস্তারিত লিখেছেন শাহেদ-বিন-আলী
‘ঢাকা সার্ভে স্কুল’ থেকে আজকের বুয়েটের ইতিহাস
‘ঢাকা সার্ভে স্কুল’ থেকে আজ পরিপূর্ণ বুয়েট। ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের পুরান ঢাকার নালগোলা এলাকায় ১৮৭৬ সালে ‘ঢাকা সার্ভে স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ সরকার মূলত বাংলা অঞ্চলে ভূমি জরিপকারী তৈরির উদ্দেশ্যে স্কুলটি তৈরি করে। বাংলার নবাব পরিবারের খাজা আহসানউল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানে আর্থিকভাবে অনুদান প্রদান করেন। ১৯০৮ সালে ‘ঢাকা সার্ভে স্কুল’ থেকে ‘আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামকরণ করা হয়। কালের বিবর্তনে ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্কুল থেকে ‘আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’-এ রূপান্তরিত হয়। হাকিম আলী এ কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল। সিভিল, ইলেক্ট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, মেটালজিক্যাল ও কেমিক্যাল—এ বিষয়গুলো নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের অধীনে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে লেখাপড়া শুরু হয়। শিক্ষার গুণগত মানের ফলে কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় হতে বেশি সময় নেয়নি। ১৯৬২ সালের ১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা হয়ে ‘আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ একটি স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। তখন এর নাম হয় ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (ইপুয়েট)। এ দিনটিই মূলত প্রতিষ্ঠানটির জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইপুয়েট বুয়েটে পরিণত হয়।

অনুষদ ও বিভাগ
পড়ালেখার গুণগত মান ও সময়ের চাহিদায় বুয়েটে সাতটি অনুষদ রয়েছে। অনুষদগুলোর অধীনে রয়েছে মোট ১৮টি বিভাগ। এর মধ্যে কেমিক্যাল অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস কৌশল, পুরকৌশল, যন্ত্রকৌশল, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল এবং স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদগুলোর অধীনে ১৩টি বিভাগে স্নাতক পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হতে পারে এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের জন্য স্নাতক পর্যায়ের বিভাগগুলো ছাড়াও আরো পাঁচটি বিভাগ ও কয়েকটি ইনস্টিটিউটে ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হতে পারে।
কেমিক্যাল অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস কৌশল অনুষদে রয়েছে কেমিকৌশল, বস্তু ও ধাতব কৌশল, ন্যানোম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড সিরামিক কৌশল এবং পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সম্পদ কৌশল বিভাগ। বিজ্ঞান অনুষদে রয়েছে রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ। পুরকৌশল অনুষদে রয়েছে পুরকৌশল ও পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ। যন্ত্রকৌশল অনুষদে রয়েছে যন্ত্রকৌশল, নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন প্রকৌশল বিভাগ। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল অনুষদে রয়েছে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল, কম্পিউটার সায়েন্স ও প্রকৌশল এবং বায়োমেডিকেল প্রকৌশল বিভাগ। স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদে রয়েছে স্থাপত্য, মানবিক এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ।
গ্লাস ও সিরামিকস ইঞ্জিনিয়ারিং, পদার্থ, রসায়ন, গণিত এবং পেট্রোলিয়াম ও মিনারেল রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং—এ পাঁচটি বিভাগে শুধু স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি হওয়া যায়। অন্য বিভাগগুলোয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি হওয়া যায়।
গবেষণার জন্য বুয়েট
বুয়েটে রয়েছে গবেষণার জন্য ইনস্টিটিউট। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হতে পারে। ইনস্টিটিউটগুলো হলো—পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (আইডব্লিউএফএম), অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি ইনস্টিটিউট (আইএটি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (আইআইসিটি), দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই), বুয়েট-জাপান ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার প্রিভেনশন অ্যান্ড আরবান সেফটি (বুয়েট-জিডপাস), নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (আইএনপিই) এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (আইইএসডি)।
ক্যাম্পাস
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুয়েটিয়ানদের নামের তালিকায় সাক্ষী হয়ে আছে শহীদ বুয়েটিয়ানরা। ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়ায় ঢোকার পথে দেখা যাবে শহীদের তালিকা। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের ভাষাসৈনিকদের স্মরণে বুয়েট ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বারেই শহিদ মিনার। অডিটোরিয়াম আর ক্যাফেটেরিয়ায় অবিরত শোনা যায় হাজারো শিক্ষার্থীর পদধ্বনি।
দাপ্তরিক অফিস
ড. এমএ রশীদ ভবন দাপ্তরিক কাজে পরিচালিত হচ্ছে। রেজিস্ট্রার ভবনের সঙ্গেই আছে উপাচার্যের বাসভবন। এছাড়া পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং এ-সংক্রান্ত আলাদা একটি ভবনও রয়েছে। ক্যাম্পাসের পেছন দিকে রয়েছে ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তর।
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি
প্রায় ২০ হাজার বর্গফুটজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির চারতলা ভবনটি ক্যাম্পাসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। লাইব্রেরিতে আধুনিক সব সুবিধা রয়েছে। এখানে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পড়ার ব্যবস্থা আছে। বুয়েট লাইব্রেরিতে রেফারেন্স ও জার্নালের একটি বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। রিপোগ্রাফিক বিভাগ নামে একটি বিভাগ রয়েছে, যাতে রেফারেন্স বই ফটোকপি করার ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পর অধিকাংশ সময় এই লাইব্রেরিতেই সময় কাটান।
মেডিকেল সেন্টার
বুয়েটে স্বাস্থ্য রক্ষার মৌলিক সুবিধা-সংবলিত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র (বুয়েট হেলথ কমপ্লেক্স) রয়েছে। রোগ নির্ণয়ে সহায়ক অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি মেশিন এবং আধুনিক স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি প্যাথলজিক্যাল ল্যাব আছে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা বিনা পয়সায় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে থাকে। মেডিসিন কর্নার থেকে ওষুধ সংগ্রহ করা যায়।
সাব পোস্ট অফিস
স্মার্টফোনের যুগে কালের সাক্ষী হয়ে আছে সাব পোস্ট অফিস।
শিক্ষকদের কোয়ার্টার ও ছাত্রাবাস/হল
ক্যাম্পাসের মাঠের উত্তর দিকে রয়েছে শিক্ষকদের কোয়ার্টার। মূল সড়কের উল্টো দিকে (দক্ষিণ) রয়েছে বুয়েটের ছাত্রাবাস। মেধাবী শিক্ষাথীরা এখানে খুব অল্প টাকার বিনিময়ে বসবাস করে। এছাড়া রয়েছে কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং শিক্ষকদের আরো একটি কোয়ার্টার। কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই রয়েছে স্টাফ কোয়ার্টার। স্নাতক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য রয়েছে ছয়টি হল এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রদের রয়েছে আলাদা একটি হল। ছাত্রীদের জন্য রয়েছে দুটি হলসহ মোট ৯টি হল। ছাত্রদের জন্য হলগুলো হলো—আহসানউল্লাহ হল, তিতুমীর হল, শের-ই-বাংলা হল, সোহরাওয়ার্দী হল, নজরুল ইসলাম হল, ড. এমএ রশীদ হল, শহীদ স্মৃতি হল এবং ছাত্রীদের জন্য আছে সাবিকুন নাহার সনি হল ও স্বাধীনতা হল।

বুয়েটের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা আবরার হত্যাকাণ্ড
বুয়েট প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে মর্মান্তিক ও মারাত্মক। এ ঘটনা দেশ ছাড়িয়ে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কুষ্টিয়ার ছেলে আবরার ফাহাদ বুয়েটের ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়। বিচারের দাবিতে সোচ্চার হন সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সে প্রেক্ষাপটে বুয়েট কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন ও ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
বুয়েটের ক্লাব
প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিমনা ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ালেখার পাশাপাশি নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, অভিনয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও বিভিন্ন ক্লাবের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মশালাও হয়ে থাকে। বুয়েটের ক্লাবগুলো, বিশেষ করে ডিবেটিং ক্লাব, ফটোগ্রাফি, শর্ট ফিল্ম, ছবি আঁকার মতো নানা প্রতিভামূলক ক্লাবে হাজারো শিক্ষার্থীর আনাগোনা রয়েছে।

নানা দিবসে ক্যাম্পাস
স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও নববর্ষে ক্যাম্পাস নানা আয়োজনে যেন এক অন্য রঙ ধারণ করে। এই দিনগুলো বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় ।
১৮৭৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পথযাত্রায় এই প্রতিষ্ঠান থেকে বহু শিক্ষার্থী নিজ নিজ স্থানে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ভবিষ্যতে রাজনীতিমুক্ত বিশেষ করে আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা যেন আর না ঘটে, এটাই কামনা সবার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

