রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রায় ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘বিজয় ৭১’ হল গত বছরের ডিসেম্বরে উদ্বোধনের কথা থাকলেও এখনো উদ্বোধন করা হয়নি। এদিকে উদ্বোধনের আগেই ১০ তলা ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা গেছে। এসব ফাটল মেরামতের পর পুনরায় পলেস্তারা খসে পড়ছে।
এর আগে, ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নির্মাণাধীন হলটির মিলনায়তনের ছাদ ঢালাইয়ের সময় ধসে পড়ে। ওই ঘটনায় অন্তত ৯ জন আহত হন।
১০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও অভ্যন্তরীণ অনেক কাজ এখনো বাকি রয়েছে। বিশেষ করে ভবনের ভেতরে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
তবে নির্মাণকাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার আগেই ভবনের দেয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা দেওয়ায় ভবনটির মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে ভবনটিতে অবস্থানরত আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে দেশে পরপর কয়েকবার ভূমিকম্প হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা ফজলুল হক হল ও মন্নুজান হলকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরপর শেরেবাংলা হলের কিছু শিক্ষার্থীকে উদ্বোধনের আগেই নবনির্মিত ‘বিজয় ৭১’ হলে স্থানান্তর করা হয়।
প্রায় ২৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই আবাসিক হলে প্রায় এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হলটিতে রয়েছে চারটি লিফট, একটি বৃহৎ মসজিদ এবং প্রায় ৩০০ আসনবিশিষ্ট আধুনিক অডিটোরিয়াম। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বিতীয় তলায় থাকছে লাইব্রেরি, ইনডোর গেমস রুম, জিমনেসিয়াম ও রিডিং রুম। নিচ তলায় রাখা হয়েছে গ্রিন জোন এবং স্থায়ী দোকানের ব্যবস্থা।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী প্রশাসন হলটির নাম নির্ধারণ করেছিল ‘শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান হল’। তবে জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে এটি ‘সাকিব-রায়হান হল’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলটির চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করে ‘বিজয় ৭১’ হল।
হলটি গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক এসএম ওবায়দুল ইসলাম।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া হলটির সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানো হয়। কিন্তু পাঁচ বছরেও তা পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন ১০ তলা আবাসিক হল এবং ২০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ করেছে রূপপুরের ‘বালিশ-কাণ্ডে’ আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। এর মধ্যে ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ১০ তলা আবাসিক হল এবং ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ২০ তলা বিজ্ঞান ভবন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন দুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
নির্মাণাধীন দুটি ভবনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যুও হয়েছে। এছাড়া, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালবাহী ট্রাকের চাপায় হিমেল নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এর আগেও বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে।
হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হল সংসদের নির্বাহী সম্পাদক শাহিব বিল্লাহ বলেন, পুরোনো হলে ফাটল দেখা দেওয়ায় নিরাপত্তার জন্য আমাদের নতুন হলে স্থানান্তর করা হয়েছে। অথচ উদ্বোধনের আগেই এখানেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্মাণকাজে গাফিলতি ও ত্রুটি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
হল সংসদের সহ-বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক শাহরিয়ার হাসান বলেন, শেরেবাংলা হলে ফাটল দেখা দেওয়ায় আমাদের অস্থায়ীভাবে নতুন হলে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এখানে এসেও বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাচ্ছি। এটি নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আরেক শিক্ষার্থী গোলাম মোস্তফা বলেন, নতুন হলে আসার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাচ্ছি। এমনকি মেরামতের পরও পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মিনহাজুল আলম বলেন, ফাটলগুলো মূলত তাপমাত্রাজনিত কারণে হয়ে থাকতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো কেটে পরীক্ষা করে দেখব। তবে এগুলো মেরামতযোগ্য এবং আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বিম ও দেয়ালের সংযোগস্থল কিংবা ভিন্ন অংশে করা প্লাস্টারের কারণে এ ধরনের ফাটল দেখা দিতে পারে। তবে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ইতোমধ্যে প্রকৌশলীদের একটি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে বলে জানান তিনি।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম ঝুঁকিপূর্ণ দুটি হল পরিদর্শন শেষে নতুন হল প্রসঙ্গে বলেন, নির্মাণাধীন নতুন হলের কাজে কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হলটির উদ্বোধন করা নিয়ে তখন উপাচার্য বলেন, উদ্বোধনের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। এখন নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তবে কাজ দ্রুত শেষ করার নামে কোনো ধরনের গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


এতিম ও দুস্থদের স্বাবলম্বী করার কার্যক্রমে ধীরগতি