দ্রুত ‘শাকসু’ নির্বাচন আয়োজনের দাবি ছাত্র সংগঠনগুলোর

দ্রুত ‘শাকসু’ নির্বাচন আয়োজনের দাবি ছাত্র সংগঠনগুলোর

দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মাঝে ছিল সদিচ্ছার অভাব। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে অচল।

বিজ্ঞাপন

সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনৈতিক চর্চা, সুদৃঢ়, যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

ছাত্র সংসদ অকার্যকর থাকার ফলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি উত্থাপনে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিনিধি না থাকায় অনেক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। কবে এবং কখন ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার স্পষ্ট কোনো রূপরেখা আসেনি।

ফলে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের কোনো কার্যকর মাধ্যম নেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, নেতৃত্বের বিকাশ ও গণতন্ত্র চর্চার জন্য শাকসু নির্বাচন জরুরি। আবার দ্রুত সময়ের মধ্যে শাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবি করেছেন শাবিপ্রবির বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বমোট ৬ বার শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯১ সালে তিনটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে শাবি। তিনটি বিভাগের ক্লাস প্রতিনিধিদের মনোনীত করার মধ্য দিয়ে শাকসু যাত্রা শুরু করে। পরের বছর শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে শাকসুর প্রথম সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে নির্বাচিত হন অর্থনীতি বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হারুন উর রশিদ। তবে এ সংসদের কোনও ভিপি ছিল না। ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচনে একইসঙ্গে সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পান শাবি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ভোটে ভিপি হন নির্বাচিত আব্দুস সালাম ও জিএস হন সাব্বির আহমেদ। এরপর ১৯৯৪ সালের ২৩ জুনের নির্বাচনে ভিপি হন দেলোয়ার ইসমাইল টিটু ও জিএস হন কামরুল ইসলাম। পরে ১৯৯৫ সালে আশরাফুল আলম রুবন ভিপি ও বদরুজ্জোহা শাহিন জিএস পদে জয় পান।

১৯৯৬ সালে পঞ্চম নির্বাচন নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে ১৯৯৭ সালের ২৫ আগস্ট সর্বশেষ শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভিপি হিসেবে কামরুল আহমেদ কাবেরী ও জিএস পদে আব্দুল্লাহ আল মামুন জয় পান। নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল ১৯টি পদের মধ্যে ১৭টিতে জয় পায়। এরপর আর গত ২২ বছরে শাকসুর কোনও নির্বাচন হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সময়ের সরকার ও সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর অনিহার কারণেই শাকসু সচল হয়নি। নিজেদের আধিপত্য খর্ব হওয়ার ভয়ে নির্বাচন চায়নি ছাত্র সংগঠনগুলো।

শাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, ছাত্র সংসদ যেকোনো সময় যেকোনো ক্যাম্পাসেই থাকা উচিত। কারণ এটা ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করে। ছাত্র সংসদ না থাকলে প্রশাসন স্বৈরতন্ত্র প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। আবার শাবিপ্রবিতে কোন সিনেট নেই, ছাত্রসংসদও নেই। অর্থাৎ ছাত্রদের কথা বলার যে প্লাটফর্ম সেটিই নেই। ফলে প্রশাসন যেকোনো সময় যেকোনো সীদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে। বিগত সময়ে দলীয় প্রভাব থাকায় ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়ে উঠেনি। এক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সংঘাত, গ্রুপিং মারামারি দেখা গিয়েছে। আবার ছাত্রদের সাথে শিক্ষকদেরও দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছিল। ফলে স্বাভাবিক শিক্ষাক্রম নানাবিধ ভাবে ব্যঘাত ঘটেছিল। এই বিষয়গুলো থেকে বের হওয়ার জন্য ছাত্র সংসদ থাকা উচিত।

ছাত্র সংসদ নিয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ভয়েস ফর জাস্টিস এবং ইসলামী ছাত্র মজলিসসহ শাবিপ্রবির বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের রয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে শাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবির কথা উঠে এসেছে সবার বক্তব্যে।

শাকসু নির্বাচন নিয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল শাবিপ্রবি শাখার সভাপতি রাহাত জামান বলেন, নির্বাচনের পূর্বে আলোচনার ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলক রূপরেখা ও সময়সূচি তৈরি অপরিহার্য। শিক্ষাবান্ধব, সহনশীল ও পক্ষপাতহীন পরিবেশ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা চাই, শাকসু হোক ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি নির্বাচনের বাস্তব গণতান্ত্রিক মঞ্চ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই যাত্রায় আমরা অটল ও প্রস্তুত।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন শাবিপ্রবি সংসদের সংগঠক জুবায়ের আহমেদ জুয়েল বলেন, শাকসু নির্বাচনের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ছাত্র স্বার্থ উপেক্ষারই প্রতিফলন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবিলম্বে নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানাই। দলীয়করণমুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করলেই শাকসু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ শাবিপ্রবির সাধারণ সম্পাদক আজাদ শিকদার বলেন, বিগত বছরগুলোতে শাবিপ্রবি থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্যের কারণে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এর ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য দাবি ও সমস্যাগুলো সাংগঠনিকভাবে তুলে ধরার গণতান্ত্রিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পাঁচ আগস্টের ‘জুলাই বিপ্লব’-এর পর দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এই প্রেক্ষাপটে আমরা অবিলম্বে শাকসু নির্বাচন আয়োজনের জোর দাবি জানাই।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শাবিপ্রবির সাবেক সম্বনয়ক ও শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন বলেন, আমাদের অভ্যুত্থানকালীন সময়ের ঐতিহাসিক নয় দফার অন্যতম দফা হলো- ছাত্রসংসদ নির্বাচন। যার জন্য শাকসু সহ প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্রসংসদ নির্বাচন জরুরি বলে মনেকরি।

শাবিপ্রবির অন্যতম শিক্ষার্থী সংগঠন ভয়েস ফর জাস্টিসের সভাপতি মো. মমিনুর রশিদ শুভ বলেন, প্রশাসনের উচিত ডাকসুর ওপর নির্ভর না করে নিজ উদ্যোগে দ্রুত নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস শাবিপ্রবি শাখার সেক্রেটারি জুনায়েদ আহমদ বলেন, বিগত ফ্যসিস্ট সরকার ছাত্র সংসদ কাঠামো যেভাবে ধ্বংস করেছে সেখান থেকে উত্তরণ করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের রুপরেখা তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাসনের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কাজ শুরু করা হয়।

সার্বিক বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাজেদুল করিম বলেন, শাকসু নিয়ে শিক্ষার্থীরা কথা বলছে। শিক্ষার্থীদের এমন চিন্তাকে আমি সঠিক মনে করি। চলমান সেমিস্টার পরীক্ষার জন্য তারা একটু ঝামেলায় পড়েছে। পরীক্ষার পর হয়তো তারাও কথা বলবে। শিক্ষার্থীরা প্রস্তুত থাকলে আমারাও তাদের এবিষয়ে সহযোগী হবো। সুন্দর ও শান্ত পরিবেশে নির্বাচন হোক এটা আমরাও চাই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন