দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা প্রতি বছরই জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ভূ-প্রকৃতিগতভাবে কিছুটা নিচু হওয়ায় আকস্মিক বন্যায় মুহূর্তেই তলিয়ে যায় ফসলের মাঠ। ফলে হাওরের কৃষি পুরোপুরি অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দেশের ধান উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ অঞ্চলে প্রধান ফসল বোরো ধান হলেও আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা ও তাপমাত্রাজনিত চাপ উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ধান পাকার সময় আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যায়। বাড়ে আর্থিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা।
এই সংকট উত্তরণে স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান চাষে আশাব্যঞ্জক সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমান প্রামানিক। এ সময় সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। যার মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চলে। তবে প্রতি বছর আগাম বন্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফসল ক্ষতির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতায় বন্যা শুরুর আগেই ধান ঘরে তোলা গেলে ক্ষতির বড় অংশ এড়ানো সম্ভব।
অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমান প্রামানিক বলেন, প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি বোরো জাতের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ধান চাষ করলে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই ফসল কাটা সম্ভব। এতে বন্যার আগে ধান ঘরে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। ২০২০ সাল থেকে হাওর অঞ্চলে এই গবেষণা চালানো হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
হাওরের কৃষি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, অগ্রহায়ণে পানি নেমে গেলে জমি প্রস্তুত করা হয় এবং ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শুরুতে ধান রোপণ করা হয়। প্রচলিত জাতের ধান পেতে এপ্রিলের শেষ কিংবা মে মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ঠিক এই সময়েই হাওরে বন্যার প্রকোপ শুরু হয়। গত ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এপ্রিলের শেষার্ধে প্রায় ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে আগাম বন্যা দেখা গেছে। ফলে এপ্রিলের মাঝামাঝির আগেই ধান কাটতে পারলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
অধ্যাপক ড. প্রামানিক বলেন, হাওর অঞ্চলে বহুল চাষ করা ধানের জাত ব্রি ধান-৯২-এর জীবনকাল প্রায় ১৬০ দিন। ফলে এই জাতের ধান রোপণের পর পেকে কর্তন করতে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এ সময়ই আগাম বন্যা নেমে আসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয় না। গবেষণায় স্বল্পমেয়াদি কয়েকটি জাত যেমন-ব্রি ধান-৮৮, ব্রি ধান-১০১, ব্রি ধান-১১৩, ব্রি ধান-১০৫ ও ব্রি ধান-২৫ নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এসব জাতের জীবনকাল গড়ে ১৪৫ দিনের মতো। একই সময়ে রোপণ করেও এসব জাত থেকে অন্তত দুই সপ্তাহ আগে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গবেষকের মতে, স্বল্পমেয়াদি জাতের ফলন অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জাতের তুলনায় হেক্টরে এক থেকে দেড় টন কম হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ কম দেখা যায়। পাশাপাশি তাপমাত্রার তারতম্য, শিলাবৃষ্টি এবং সময়মতো বপন ও কর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ধানের শীষ তৈরির সময় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে বা ৩৫ ডিগ্রির বেশি হলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ড. প্রামানিক বলেন, হাওরে যেহেতু স্বল্প সময়ে ধানের চারা রোপণ করতে হয়, আবার একই সময়ে ধান পরিপক্ব হয়, তাই বন্যার ক্ষতি এড়াতে হাওরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। আগাম বন্যা যেহেতু এপ্রিলের শেষার্ধে অথবা মে মাসের শুরু হয়, তাই কৃষির উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, হার্ভেস্টার, সেচ সুবিধাসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ সহজলভ্য হবে। এতে দ্রুত এবং একই সঙ্গে ফসল তোলা যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

