জুলাই সনদ ও সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নের দাবি ডাকসুর

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার

জুলাই সনদ ও সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নের দাবি ডাকসুর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘জুলাই সনদ ও সংস্কার: শহীদ পরিবারের আকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক ব্যতিক্রমী সংস্কার আলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার বিকেল ৩টায় ডাকসু প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জুলাই আন্দোলনের গণভোটে বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসি জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থি। দ্রুত এ সনদ বাস্তবায়ন না হলে জনগণ আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।

স্বাগত বক্তব্যে ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক এম এম আল মিনহাজ বলেন, প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সরকার যদি সংবিধানের দোহাই দিয়ে পুরোনো শাসনব্যবস্থায় ফিরতে চায়, তা মেনে নেওয়া হবে না। অতীতে গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা পুনরাবৃত্তি হলে তা জনগণের প্রত্যাশার সরাসরি বিরোধী হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো. বেলাল হোসাইন অপু বলেন, জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে কোনো ধরনের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন গ্রহণযোগ্য নয়। সংবিধানের অজুহাতে পুরোনো ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি ভালো হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

একই সুরে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রাইসুল ইসলাম বলেন, নতুন সরকারের কর্মকাণ্ডে আবারও তরুণ সমাজকে রাজপথে নামার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিচারব্যবস্থার পুরোনো সংকট ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না। স্বচ্ছ নিয়োগ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, জুলাই আন্দোলনের বিশাল আত্মত্যাগের পরও প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে। এখনও সময় আছে- জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাই বিপ্লবী পরিষদের সদস্য সচিব সাদিল আহমেদ বলেন, ১৪০০ শহীদের আত্মত্যাগ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য। সেই লক্ষ্য ব্যাহত হলে জনগণ আবারও আন্দোলনে নামবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। তারা শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন, বিচার নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

শহীদ ইব্রাহীমের মা বলেন, তার একমাত্র প্রত্যাশা- দেশে আর কোনো মা যেন সন্তানের লাশ না পায় এবং পুরোনো শাসনব্যবস্থা যেন আর ফিরে না আসে।

শহীদ জিসানের মা জানান, একমাত্র সন্তানকে হারানোর পরও তিনি দেশের জন্য তার আত্মত্যাগে গর্বিত। তবে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, দ্রুত সনদ বাস্তবায়ন করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

শহীদ দ্বীন ইসলামের পিতা বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনে গণভোটে অংশ নিয়ে তারা জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, এখন এর বাস্তবায়নই তাদের প্রধান দাবি।

শহীদ রাকিবের ভাই সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের কারণ জানতে চেয়ে বলেন, গণভোটে সমর্থন দেওয়ার পরও কেন সনদের বাস্তবায়নে পিছিয়ে আসা হচ্ছে, তার জবাব দিতে হবে।

শহীদ সোহেল রানার ভাই অভিযোগ করেন, নিখোঁজ হওয়ার পর তার ভাইয়ের লাশ বেওয়ারিস হিসেবে দাফন করা হয়, যা বিচারহীনতার ভয়াবহ উদাহরণ।

এখনও বহু পরিবার তাদের স্বজনের খোঁজে ঘুরছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শহীদ হাসানের পিতা মনির হোসেন বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর ছেলের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এখনও অনেক শহীদের পরিচয় নিশ্চিত হয়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাশা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, গণভোট, মানবাধিকার কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। প্রয়োজনে আন্দোলনের মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান উদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন ও কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনিরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...