পুরান ঢাকার যানজট আর কোলাহল ঠেলে জটলা গলিতে ঢুকতেই দেহ-মনে ছড়িয়ে পড়ে অন্যরকম এক অনুভূতি। এটি কেবল কাগজের কোনো সুবাস নয়; এটি যেন ইতিহাস, আবেগ আর শতকোটি শব্দের জলজ্যান্ত এক উপাখ্যান। বুড়িগঙ্গার জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, যা শুধুই কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের পাইকারি বাজার নয়, বরং বাংলাদেশের বই ও প্রকাশনা শিল্পের স্পন্দনশীল হৃৎপিণ্ড।
আজকের বহুতল ভবনের এই চকচকে বাংলাবাজারের রূপটি কিন্তু রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে জড়িয়ে আছে দেশভাগ আর ইতিহাস বদলের নানা বাঁক। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে ঢাকার প্রকাশনা ব্যবসা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। অল্প কিছু সাহসিক ব্যবসায়ী কলকাতা থেকে শিল্প-সাহিত্যের বই এনে এখানে বিক্রি করতেন। তবে দেশভাগের পরই দৃশ্যপট বদলাতে থাকে।
মাটির সুবাস আর বাংলা ভাষাকে আপন করে জন্ম নিতে থাকে নওরোজ কিতাবিস্তান, খোশরোজ কিতাব মহল, স্টুডেন্ট লাইব্রেরি, গ্রেট ইস্ট কিংবা পুঁথিপত্রের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। শুধু ব্যবসায়িক মানসিকতা নয়, সে সময়ের অনেক প্রকাশক ছিলেন একাধারে লেখক ও পাঠক। নওরোজ কিতাবিস্তানের কর্ণধার প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলীর মতো মানুষের হাত ধরে তৈরি হয় এখানকার বইয়ের রাজ্যের মূল ভিত্তি।
সময়ের স্রোতে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে বাংলাবাজারে। ষাট বা সত্তরের দশকে যেসব প্রকাশনা চলত টিনের একতলা ঘরে, সেখানে আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে মান্নান মার্কেট, ইসলামি টাওয়ার, গিয়াস গার্ডেন কিংবা বিশাল বুকস মার্কেটের মতো বিশালকায় বহুতল সব বাণিজ্যিক ভবন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্যারিদাস রোড থেকে হেমেন্দ্র চন্দ্র দাশ রোড—পুরো এলাকাটিই আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল বইপাড়ায়। আশির দশকে সময়, আগামী, অনন্যা বা অনুপমের মতো নতুন ধারার প্রকাশনীগুলো আসার পর বাংলাবাজারের গতিপথ লাভ করে এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ।
প্রকাশকেরা জানান, ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাবাজারের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল টিনের তৈরি একতলা ঘরে। সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও আধুনিক মার্কেট। এর মধ্যে মান্নান মার্কেট অন্যতম, যেখানে নিচতলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত রয়েছে বইয়ের দোকান।
বর্তমানে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বইয়ের দোকান এবং চার শতাধিক প্রকাশনী নিয়ে গমগম করছে এলাকাটি। প্রতিদিন কোটি টাকার ওপর বিকিকিনি আর মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার উৎস এই বাংলাবাজার।
সবচেয়ে বড় কথা, বইয়ের পাতার সুবাস আর সুচিন্তার আড্ডা কিন্তু এখানে কখনোই থেমে থাকেনি। এককালের বিউটি বোর্ডিংয়ের বিখ্যাত সাহিত্য আড্ডা কিছুটা ম্লান হলেও, এখানকার অলিগলিতে আজও বসে লেখক-প্রকাশক আর পাঠকদের মিলনমেলা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিব খান বলছিলেন, অন্য যেকোনো বইয়ের দোকানের চেয়ে বাংলাবাজারের আমেজটাই আলাদা। এখানে দুর্লভ ও পুরোনো বই কম দামে যেমন মেলে, তেমনই মেলে একটা আলাদা আবহ। বইয়ের সেই সোঁদা গন্ধটাই বারবার এখানে টেনে আনে ।
একই সুর ২৫ বছর ধরে বই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বই নিকেতনের স্বত্বাধিকারী আবদুল কাদেরের কণ্ঠেও।
তিনি বলেন, আমি ২৫ বছর ধরে বাংলাবাজারে বইয়ের ব্যবসা করছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে বই কিনতে আসেন। অনলাইনভিত্তিক বিক্রি বাড়লেও পাঠ্যপুস্তক ও সহায়ক বইয়ের চাহিদা এখনো বেশ ভালো। বাংলাবাজার শুধু একটি বাজার নয়, এটি দেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে।
ডিজিটাল দুনিয়া আর ই-বুকের রমরমা যুগেও বাংলাবাজারের প্রতিটি মোড় আর ধূলিমলিন গলিপথ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কাগজের গন্ধ, অক্ষরের স্পর্শ আর বই ভালোবাসার আবেশ কখনোই হারিয়ে যাওয়ার নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


