মেধায় হলের সিট, বদলে গেছে রুয়েটের আবাসিক জীবন

মেধায় হলের সিট, বদলে গেছে রুয়েটের আবাসিক জীবন

ভোর ৪টা। চারপাশ নিস্তব্ধ। ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের সামান্য কিছু জামাকাপড় আর বইখাতা ব্যাগে গুছিয়ে হল ছাড়ছেন এক তরুণ। চোখে-মুখে আতঙ্ক, সামনে কোথায় আশ্রয় মিলবে তাও অজানা। তার অপরাধ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শান্তিতে পড়াশোনা করতে চাওয়া।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (MSE) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ওই শিক্ষার্থীর জন্য ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের সেই রাত ছিল জীবনের সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ায় ছাত্রলীগের তৎকালীন এক নেতার তোপের মুখে পড়েন তিনি। গালিগালাজ, অপমান, ধাক্কাধাক্কির পর পরদিন ভোরেই বাধ্য হয়ে হল ছাড়তে হয়। প্রথমে বন্ধুর বাসা, পরে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নেন। অবশ্য এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সে সময় রুয়েটে অসংখ্য সাধারণ শিক্ষার্থীর বাস্তবতা ছিল এমনই।

বিজ্ঞাপন

রুয়েটের তৎকালীন আবাসিক হলগুলো ছিল কার্যত দলীয় নিয়ন্ত্রণে। দুই হাজারের বেশি আবাসিক আসনের প্রায় ৯০ শতাংশই ক্ষমতাসীন ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও নিজেদের বৈধ সিটে উঠতে পারতেন না। সিট পেতে হলে রাজনৈতিক নেতাদের আনুগত্য, মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিতি, কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং ‘বড় ভাইদের’ নির্দেশ মেনে চলা যেন অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছিল। যারা তা মানতে চাইতেন না, তাদের অনেকেই হলে থাকার অধিকার হারাতেন, অপমানিত হতেন কিংবা হল ছাড়তে বাধ্য হতেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেকেই বছরের পর বছর বিনা খরচে হলে অবস্থান করলেও প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদেরই ভাড়া বাসায় থেকে হলের ফি পর্যন্ত পরিশোধ করতে হতো।

শুধু সিট নয়, তখন শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাধীনতাও ছিল সীমাবদ্ধ। কী বলা যাবে, কোথায় যাওয়া যাবে, কার সঙ্গে মিশতে হবে কিংবা কোনো বিষয়ে মতপ্রকাশ করা যাবে কি না—এসব ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করত বলে অভিযোগ করেছেন অনেক সাবেক শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে পেশিশক্তির উপস্থিতি, ভয়ভীতি এবং ক্ষমতার প্রদর্শন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের নীরব অসহায়ত্ব তৈরি করেছিল। অনেকেই পড়াশোনার স্বার্থে প্রতিবাদ না করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াকেই নিরাপদ মনে করতেন। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও ছিল সে সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয়।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১০ আগস্ট সিন্ডিকেটের ১০৫তম (জরুরি) সভায় ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রুয়েট প্রশাসন। এরপর থেকেই আবাসিক হল পরিচালনায় নতুন নীতিমালা, মেধাভিত্তিক সিট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করা হয়।

দুই বছর পর সেই পরিবর্তনের প্রভাব এখন দৃশ্যমান। দলীয় দখলদারিত্ব ও সিট-বাণিজ্যের পরিবর্তে প্রথম বর্ষ থেকেই মেধা ও নির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে আবাসন নিশ্চিত করা হচ্ছে। ডাইনিং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই মিল ম্যানেজার নির্বাচন করা হচ্ছে। রিডিং রুম, কমন রুম, প্রার্থনাকক্ষ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ভেন্ডিং মেশিন, অটো চা-কফি মেশিন, অটো প্রিন্টিং সুবিধাসহ বিভিন্ন সেবা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এখন হলে থাকার জন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, কোনো বড় ভাই কিংবা কোনো পেশিশক্তির ছত্রচ্ছায়া প্রয়োজন হয় না।

সার্বিক পরিবর্তন নিয়ে রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর হল নীতিমালা প্রণয়ন করে মেধার ভিত্তিতে এবং সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রেখে আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার কাজ করছে। ইতোমধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসনের আওতায় আনা হয়েছে। ছেলে শিক্ষার্থীদেরও চারটি ব্যাচকে পূর্ণাঙ্গ এবং একটি ব্যাচকে আংশিক আবাসিক সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, রুয়েটকে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দিতে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।

যে শিক্ষার্থী একসময় রাজনৈতিক চাপে ভোররাতে হল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, তিনিও বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, এখন হলে থাকতে কারও অনুমতি লাগে না, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও কোনো ভয় নেই, নিজের মতপ্রকাশ বা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করলেও কোনো চাপ অনুভব করতে হয় না। শিক্ষার্থীদের অনেকের মতে, আজকের রুয়েটে সিট নির্ধারণ করে মেধা, রাজনীতি নয়; পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে নিয়ম, পেশিশক্তি নয়। আর এ কারণেই দীর্ঘদিন পর আবাসিক হলগুলোতে ফিরে এসেছে পড়াশোনাকেন্দ্রিক, স্বাধীন ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ—যা ধরে রাখাই এখন পুরো রুয়েট পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন