ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্যের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেদিন কী ঘটেছিল সেটি আমার দেশকে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে থাকা সাম্যের দুই বন্ধ আশরাফুল আলম রাফি ও মো. আব্দুল্লাহ আল বায়েজিদ। আশরাফুল আলম রাফি অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের এবং মো. আব্দুল্লাহ আল বায়েজিদ শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী।
গত মঙ্গলবার (১৩ মে) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে নবীবরণের অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেটি শেষ হতে রাত ১১টা বেজে যায়। পরে শাহরিয়ার আলম সাম্য তার দুজন বন্ধু আশরাফুল রাফি ও বায়েজিদকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি সংলগ্ন গেটের ভেতেরের দোকানগুলোতে যায়। রাত হওয়ার টিএসসি সংলগ্ন গেইটটি বন্ধ থাকায় কালি মন্দিরের গেইট দিয়ে তাদের যেতে হয়েছিল। রাতের হালকা খাবার খেয়ে ফেরার পথে আগে থেকে বাইকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্রুপের এক বাইকে ধাক্কা লাগলে অতর্কিত হামলা, কিল-ঘুষি ও অস্ত্র দিয়ে মারার ঘটনা ঘটে। সাম্যকে ছুরি বা অস্ত্র দিয়ে হঠাৎ করে পায়ে 'কোপ' দেওয়া হয়। এতে প্রচুর রক্তপাত ঘটে। ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়ায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েন রাফি ও বায়েজিদরা- এমনটিই বক্তব্য মিলিছে রাফি ও বায়োজিদের সাথে আলাপকালে।
উদ্যানে রাতের খাবার খেতে যাওয়ার বিষয়ে রাফি বলেন, আমরা দুপুর থেকে খাবার খাইনি। আইইআর-এ (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) নবীনবরণ অনুষ্ঠান শেষ হতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ক্যাম্পাসে তেমন খাবারের দোকান না থাকায় আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরের দিকটায় কাবাব বা হালকা কিছু খেতে গিয়েছিলাম। আমরা তিনজন ছিলাম। সাম্য বাইক চালাচ্ছিল, ওটা তারই বাইক ছিলো। টিএসসির দিকে উদ্যানের গেইট বন্ধ থাকায় আমরা কালি মন্দিরের দিক দিয়ে ঘুরে খাবারের দোকানগুলো আসি। সেখানে একটা দোকানে রুটি-কাবাবও খাই। আমরা যেহেতু ক্যাম্পাসের তাই প্রায় সময়ই এখানে এসে খাবার খেতাম। পরে খাবার খেয়ে ক্যাম্পাসের দিকে ফেরার পথে পুনরায় কালি মন্দিরের গেইট দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময়ে এই ঘটনা ঘটে।
রাফি আরো বলেন, ফেরার পথে সাম্যই বাইক চালাচ্ছিলো। মুক্তমঞ্চ এলাকা পার হলে একটি ছেলে ইলেকট্রিক শক দেওয়া এবং একই সাথে উচ্চ সাউন্ডের এমন একটি যন্ত্র দিয়ে আমাদের দিকে নিশানা করে। পরে সাম্যই তাকে বাধা দেয় এবং ধমক দেয়। পরে ছেলেটি দৌড়ে উদ্যানের মাঝামাঝিতে গেলে তাকে ধরতেই বাইক নিয়ে পিছু করি। এসময় মাঠের মাঝে একটি গ্রুপ বাইকে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। ভুলকরে তাদের একটি বাইকে আমাদের বাইকের ধাক্কা লাগলে একটি বাইক মাটিতে পড়ে যায়। এরপর আচমকা কিল ঘুষি, ইট দিয়ে আঘাত করা শুরু করে গ্রুপটির সদস্যরা। তাদের সাথে সেসময় ৭-৮ জন থাকলেও মুহূর্তেই ১০-১২ জন হয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই আমাদের মেরে আহত করে।
রাফি আরো বলেন, আমি বাইকে সবার পেছনে থাকায় বাকি দুজনকে বা সাম্যকে কীভাবে মেরেছে সেটা খেয়াল করতে পারিনি। সে জায়গায় কোনো আলো ছিল না। হঠাৎ দেখি সাম্যের পায়ে রক্ত। এটা দেখে আমরা চিৎকার শুরু করলে উদ্যানে থাকা আশপাশ থেকে ১০-১৫ জন মানুষ সেখানে জড়ো হয়৷ পরে তাদের একজনকে ধরে উপস্থিত লোকদের কাছে দিয়ে আমরা সাম্যকে নিয়ে বাংলা অ্যাকাডেমির গেইট পর্যন্ত এসে রিকশা নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরমধ্যেই সে আমাদের থেকে হারিয়ে যায়। আমি এটা মেনে নিতে পারছি না। নিজে এখন ট্রমার মধ্যে আছি।
উদ্যানে যে গ্রুপটির কাছে মারধরের শিকার হন সাম্যরা সেই গ্রুপটি নেশা করতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানান বায়োজিদ। তিনি বলেন, আমি বাইকের মাঝে বসা ছিলাম। আমরা রাতের খাবার খেয়ে বের হওয়ার পরে একটি ছেলে আমাদের দিকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া সাদৃশ্য একটি যন্ত্র নিশানা করলে সাম্য বাইকে করে তাকে তাড়া করে। যাওয়ার পথে একটি বাইকের সাথে ধাক্কা লাগলে সেখানকার মানুষজন এসে আচমকা মারধর শুরু করে। আমরা নিজেদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেছি। আমার মাথায় ঘুষি দেয় একজন। খুবই উগ্র মেজাজে ছিল তারা। হঠাৎ করে সাম্যের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি ব্যাপক রক্তপাত হচ্ছে। ঘটনাটা দুমিনিটের কম সময়ে ঘটে গেছে। খুব সাধারণ ঘটনা থেকে সাম্যকে তারা ছুরি দিয়ে কোপাবে এটা কল্পনাও করতে পারিনি। পরে আমি রাফি আর উদ্যানে বিড়ি সিগারেট বিক্রি করে এমন একটি ছেলেসহ মোট তিনজন মিলে সাম্যকে কোলে নিয়ে কালি মন্দিরের গেইটে এসে রিকশা নেই৷ পরে হাসপাতালে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে।
যারা আমাদের আক্রমণ করেছে তারা নেশা করেছে মনে হয়েছে। কারণ, এমন উগ্র আচরণ নেশাখোররাই করে সাধারণত।
পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে অনেকেই আসে। তবে আমার সাথে সাম্যের সম্পর্কে অন্য পর্যায়ের। প্রত্যেকের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একটা ফ্রেন্ডসার্কেল থাকে। সাম্য আমাদের সার্কেলের।
এদিকে উক্ত ঘটনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও ভিসি-প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেছেন। বুধবার বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রথম নামাজে জানাজা শেষে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায় নিজ গ্রামে তাকে দাফন করা হয়। এঘটনায় বৃহস্পতিবার শোক দিবস ঘোষণা করে অর্ধদিবস ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও উদ্যানের টিএসসি সংলগ্ন গেইটটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়াল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়াও মাদকের আখড়া গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যানে অবস্থিত দোকানগুলো আজকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

