রুয়েটে জুলাই হামলা-মামলার আসামিরা এখনো স্বপদে

মেহরান আল বান্না, রুয়েট

রুয়েটে জুলাই হামলা-মামলার আসামিরা এখনো স্বপদে

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারভুক্ত একাধিক কর্মকর্তা এখনো স্বপদে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া, কর্মস্থলে পুনরায় যোগদান গ্রহণ এবং দায়িত্ব অব্যাহত রাখার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মামলার বাদী, জুলাইযোদ্ধা ও শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণেই অভিযুক্তরা এখনো স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাইযোদ্ধা আমানুল্লাহ আমানের দায়ের করা মামলার এজাহারে থাকা চার কর্মকর্তা এখনো রুয়েটে কর্মরত রয়েছেন। তারা হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক রুয়েট শাখার সভাপতি ও গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরের সেকশন অফিসার রাইসুল ইসলাম রোজ, হিসাব শাখার জুনিয়র অডিট অফিসার রফিকুল ইসলাম বিপু, গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মুফতি মাহমুদ রনি ও টেকনিক্যাল অফিসার মাহাবুব সালাম সেতু। এছাড়া পৃথক আরেকটি হামলা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শফিকুর রহমান বাদশা-এর ছেলে মাহমুদুর রহমান দিপনও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে কর্মরত রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মামলার পর কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং পরবর্তী সময়ে তাদের যোগদান গ্রহণ এবং পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। চলতি মাসের শুরুতে রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে রাইসুল ইসলাম রোজের পুনরায় যোগদানপত্র গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ সেশনে রুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি থাকা রাইসুল ইসলাম রোজ পরবর্তী সময়ে ‍রুয়েটের গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরে সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি অনুসন্ধান নথিতে বিতর্কিত নিয়োগের তালিকায়ও তার নাম উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ মেয়র লিটনের মেয়ে অর্ণার গানম্যান ছিলেন বলেও জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার আরিফ আহমেদ চৌধুরী বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে আমার কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই। ছাত্রজীবনে কে কী করেছে, সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি, তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে মামুন-অর-রশিদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। ২০২৫ সালের ৪ মে রুয়েট ক্যাম্পাস থেকে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো, রুয়েটের নিরাপত্তা শাখার দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। মামলার নথি অনুযায়ী, তিনি দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং তৎকালীন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। গত ৫ আগস্ট রাজশাহীর আলুপট্টি এলাকায় ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনায় রুয়েটের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততারও অভিযোগ রয়েছে।

মামলার বাদী ও জুলাইযোদ্ধা আমানুল্লাহ আমান বলেন, এজাহারভুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সাময়িক বরখাস্ত রাখার দাবি জানান তিনি।

উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. আব্দুর রাজ্জাক এ বিষয়ে বলেন, কয়েকজন কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় এজাহারভুক্ত কর্মকর্তাদের স্বপদে বহাল থাকা প্রশাসনের জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাদের দাবি, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করে স্বচ্ছ তদন্তের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমর্যাদা ও শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন