সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন নির্বাচনের প্রাথমিক রূপরেখা ঘোষণা করে। কিন্তু সরকারের আপত্তির মুখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, গত ১৪ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বনাম সরকারের মধ্যে যা ঘটেছে, তাতে প্রমাণ হয়েছে যে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন নেই। তিনি বলেন, আমরা সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক সহযোগিতার বিরোধিতা করছি না। কিন্তু এই সহযোগিতার নামে ইসির সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট, চূড়ান্ত, সময়বদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণাসহ ৮ দফা দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় লিখিত বক্তব্যে গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও দৃঢ় প্রতিবাদের সঙ্গে বলতে চাই—নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যদি সরকারের আপত্তি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়, তাহলে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের ভোটাধিকার নিঃসন্দেহে হুমকির মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে সম্পন্ন করার একটি প্রাথমিক রূপরেখা ঘোষণা করে। প্রথম ধাপের নির্বাচন ১২ নভেম্বর এবং শেষ ধাপের নির্বাচন ২৭ মে করার পরিকল্পনা জানানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সরকারের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রকাশ্যে ওই সময়সূচি নিয়ে আপত্তি জানান। এরপরই ইসি তার ঘোষিত রূপরেখাকে ‘পুরোপুরি প্রাথমিক’ বলে পুনর্ব্যাখ্যা করে এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার কথা জানায়।
তিনি বলেন, এখানেই জনগণের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে—একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তার নির্বাচনি রূপরেখা প্রকাশ করার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরকারের আপত্তির মুখে কেন অবস্থান পরিবর্তন করল?
আরো বড় প্রশ্ন হলো—সরকারের নিয়ন্ত্রণ, চাপ ও প্রভাবের কাছে যদি নির্বাচন কমিশন এভাবে নমনীয় হয়ে পড়ে, তাহলে সেই কমিশনের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না?
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ইসির সিদ্ধান্ত যদি সরকারের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা কার্যত কোথায় থাকে? জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান যদি সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার কাছে জবাবদিহি করে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, ইসি সচিব আখতার আহমেদ প্রকাশ্যে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং তার বক্তব্যের বিপরীতে কোনো মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। এতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে জনগণের উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই—নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সরকারের মন রক্ষা করা নয়; সংবিধান রক্ষা করা। নির্বাচন কমিশনের দায় সরকারের কাছে নয়; জনগণের ভোটাধিকারের কাছে। একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে জবাবদিহি করবে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইসিকে যদি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়, তাহলে জনগণের ভোটের প্রতি আস্থা নষ্ট হবে এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, আমরা আশঙ্কা করছি, নানা প্রশাসনিক ও অন্যান্য অজুহাত দেখিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার একটি পরিকল্পিত প্রবণতা তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে অনির্বাচিত প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে জনগণের ভোটাধিকার, স্থানীয় গণতন্ত্র ও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব আরও পিছিয়ে যাবে।
আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই—অনির্বাচিত প্রশাসক কোনোভাবেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিকল্প হতে পারেন না।
স্থানীয় সরকার জনগণের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা করা কোনো সরকারের দয়া, অনুগ্রহ বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি জনগণের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন দায়িত্বে রাখা গণতন্ত্রের প্রতি সরাসরি অবমাননা।
তিনি ৮ দফা দাবি জানিয়ে বলেন—ইসিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্বাচনের সময়সূচি ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। কোনো মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না; স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না। জনগণের ভোটাধিকার স্থগিত রেখে প্রশাসনিক অজুহাতে অনির্বাচিত ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করা চলবে না; দ্রুত একটি সুস্পষ্ট, চূড়ান্ত, সময়বদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে এবং তা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে;
নির্বাচনে সকল প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ এবং কার্যকর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা দিতে হবে; ইসির সাংবিধানিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারকে প্রকাশ্য ও কার্যকর নিশ্চয়তা দিতে হবে; স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে বর্তমান সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রশাসকদেরকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার জন্য ইসির সংবিধানের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী সিদ্ধান্ত বাতিলসহ জামায়াতের পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে দেওয়া ৯ দফা দাবি কার্যকর করতে হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসিকে সহযোগিতার নামে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সমন্বয়ের নামে চাপ এবং প্রশাসনিক যুক্তির আড়ালে নির্বাচন বিলম্বিত করার অপচেষ্টা জনগণ মেনে নেবে না। ইসিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সরকারের চাপের দিকে নয়, সংবিধানের দিকে তাকান। কোনো রাজনৈতিক পক্ষের স্বার্থের দিকে নয়, জনগণের ভোটাধিকারের দিকে তাকান। ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করার দিকে নয়, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার দিকে তাকান।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে কোনো টালবাহানা চলবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কোনো কৌশল জনগণ মেনে নেবে না। জামায়াত ইসির স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক মর্যাদা রক্ষার জন্য সোচ্চার থাকবে। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করা এবং অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার সংগ্রামে আমরা জনগণের পাশে থাকব।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশ ও সংবিধান রক্ষার স্বার্থে ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
এ সময় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও মোয়াযযম হোসাইন হেলাল এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল উপস্থিত ছিলেন।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


