সংঘর্ষের কারণ সম্পর্কে শিবিরের দাবি

জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর চায় শিবির, ছাত্রদল চায় ওপেন টেন্ডার

জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর চায় শিবির, ছাত্রদল চায় ওপেন টেন্ডার
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জকসু নেতাসহ ছাত্রশিবির ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল-যুবদলের হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় ছাত্রশিবির। হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে সংগঠনটি। রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি জানানো হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জকসু নেতা, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী এবং ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ, ছাত্রশিবির ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল-যুবদলের বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ থেকে এই দাবি জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

রাত ৮টার দিকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে নেতৃত্ব দেন শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ। পরে একই দাবিতে পুরানা পল্টনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তারা।

এ সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে নিজেদের সন্ত্রাসী সক্ষমতা যাচাইয়ের এই অপচেষ্টা ছাত্রদলের জন্যই বুমেরাং হবে বলে মন্তব্য করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ১৬ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ও টেন্ডারবাজি চালিয়ে যে পতিত স্বৈরাচার আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তাদের করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিন। ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত এই নতুন বাংলাদেশে কোনো ধরনের দখলদারিত্ব, লেজুড়বৃত্তি ও মাস্তানির রাজনীতি দেশের ছাত্রসমাজ আর এক চুলও সহ্য করবে না। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উদযাপন অনুষ্ঠান চলাকালে জকসু নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এবং ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল ও যুবদলের চিহ্নিত ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা বর্বরোচিত হামলা চালায়। এসব হামলায় বহু নেতাকর্মী আহত হন।

তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ অনুষ্ঠান চলাকালে শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকট নিরসন ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরসহ বিভিন্ন যৌক্তিক দাবির প্ল্যাকার্ড নিয়ে অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু প্রক্টর অফিস ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের পথ আটকে প্ল্যাকার্ডগুলো ছিঁড়ে ফেলে। পরবর্তীতে জকসুর ভিপি শিক্ষার্থীদের ভেতরে নিতে এলে প্রক্টর অফিস এবং জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ও সদস্য সচিব শামসুল আরেফিনের নেতৃত্বে পুনরায় পথ আটকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গায়ে হাত তোলা হয়।

মূলত, ক্যাম্পাসের বড় বাজেটের উন্নয়ন কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকবে এবং কেউ চাঁদাবাজি করতে পারবে না। কিন্তু ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার চাঁদা ও অবৈধ কমিশনের ভাগ পাওয়ার লোভী মানসিকতা থেকেই ছাত্রদল সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের বিরোধিতা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে।

এই হামলায় জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, এজিএস মাসুদ রানাসহ ইনকিলাব মঞ্চ ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী, কর্তব্যরত সাংবাদিক এবং অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে আহতরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও হামলাকারীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। সেখানে থাকা রোগীদেরও রেহাই দেয়নি।

একইভাবে, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের মাগফিরাত কামনা ও আহতদের সম্মাননা প্রদান উপলক্ষে ছাত্রশিবির ঢাকা কলেজ শাখার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির প্রস্তুতিকালে ছাত্রদলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। তারা অনুষ্ঠানস্থলের দায়িত্বশীলদের হাত থেকে ব্যানার কেড়ে নেয় এবং রামদা, চাপাতিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। একই ধারাবাহিকতায় ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরও বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। ছাত্রদল ও যুবদলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হলের প্রধান গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দিয়ে হামলা করে। পরে হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে নিজেদের তালা ঝুলিয়ে দেয়। এ ন্যাক্কারজনক ও কাপুরুষোচিত হামলায় যুবদলের কুখ্যাত ক্যাডার নয়ন হেলমেট পরে একদল সন্ত্রাসীকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি অংশ নেয়। এমনকি ঢাকা আলিয়ার অধ্যক্ষের ওপরও তারা হামলা চালায়।

shibir33

নূরুল ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাসের শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকবে এবং কেউ চাঁদাবাজি করতে পারবে না। কিন্তু ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার চাঁদা ও অবৈধ কমিশনের ভাগ পাওয়ার লোভী মানসিকতা থেকেই ছাত্রদল সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের বিরোধিতা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও জকসু প্রতিনিধিদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি করতে না পেরে এই সন্ত্রাসীরা আজ উন্মাদ হয়ে গেছে।

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিগত কিছুদিন ধরে দেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এক সুসংগঠিত উপায়ে ছাত্রসংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে একের পর এক সমন্বিত হামলা চালানো হচ্ছে। ভিত্তিহীন গুজবকে হাতিয়ার বানিয়ে খোদ থানার ভেতর ডাকসু নেতাদের ওপর বর্বরোচিত হামলার মাধ্যমে এই নোংরা রাজনীতির ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের পর জকসু নেতৃবৃন্দের ওপর এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হলো।

সংবাদ সম্মেলন থেকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো-

১. সিসিটিভি ফুটেজ ও ছবির সাহায্যে জকসু জিএস আব্দুল আলিম আরিফের চোয়াল ভেঙে দেওয়া জবি ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান রুমি ও জাফর, ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসার ঘটনায় জড়িত যুবদল নেতা নয়ন এবং বেরোবিতে হামলাকারী বহিরাগত সকল সন্ত্রাসীকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

২.সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা এবং অডিটোরিয়ামে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্টর অফিসের যেসকল কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

৩. জকসু নেতৃবৃন্দ, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং কর্তব্যরত আহত সাংবাদিকদের সুচিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারকে বহন করতে হবে।

৪. ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার হলের নিয়ন্ত্রণ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের আবাসিক নিরাপত্তা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

৫. শিক্ষার্থীদের মূল দাবি অনুযায়ী জবি দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ অবিলম্বে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে এসব হামলার প্রতিবাদে ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত গণজমায়েত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্রশিবির। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি দেয়া হবে বলে তারা জানান।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন