হাবিপ্রবি গবেষকের সাফল্য

দুধ-ডিম ও পশুখাদ্যে ব্যাকটেরিয়া শনাক্তে প্রযুক্তি উদ্ভাবন

দুধ-ডিম ও পশুখাদ্যে ব্যাকটেরিয়া শনাক্তে প্রযুক্তি উদ্ভাবন

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) খাদ্য নিরাপত্তায় এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আতিকুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় উদ্ভাবিত হয়েছে Loop-Mediated Isothermal Amplification (LAMP) ভিত্তিক একটি পরীক্ষা পদ্ধতি, যা মাত্র ৯০ মিনিটে খাদ্যবাহিত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া Bacillus cereus শনাক্ত করতে সক্ষম। এই ব্যাকটেরিয়া ডায়রিয়া ও খাদ্যে বিষক্রিয়ার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, যা বাংলাদেশের খাদ্যশৃঙ্খলে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ের নমুনার প্রায় ৮০ শতাংশ অন্তত একটি টক্সিন জিনের জন্য পজিটিভ ছিল। পশুখাদ্যে সর্বোচ্চ দূষণ পাওয়া গেছে, পাশাপাশি দুধ ও ডিমেও উল্লেখযোগ্য দূষণ ধরা পড়েছে। এতে স্পষ্ট হয় যে Bacillus cereus পূর্বধারণার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

প্রচলিত PCR পরীক্ষায় ফলাফল পেতে ৩-৫ ঘণ্টা সময় লাগে এবং ব্যয়বহুল থার্মাল সাইক্লার প্রয়োজন হয়। প্রতি পরীক্ষার খরচও তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে, নতুন LAMP প্রযুক্তি মাত্র ৯০ মিনিটে ফলাফল দেয়, খরচ কম (প্রায় ২ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার), এবং সাধারণ ওয়াটার বাথ বা হিটিং ব্লক দিয়েই পরীক্ষা করা যায়। সংবেদনশীলতার দিক থেকেও LAMP এগিয়ে— এটি প্রায় দশ হাজার গুণ বেশি সংবেদনশীল এবং ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ ডায়াগনস্টিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করেছে।

গবেষণার তাৎপর্য তুলে ধরে ড. আতিকুল হক বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ খাদ্যবাহিত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্রুত শনাক্তকরণের একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী ও বাস্তবসম্মত প্রযুক্তি অর্জন করেছে। আমরা সাধারণত মাত্র ৪০ মিনিটেই ব্যাকটেরিয়া নির্ণয় করতে পারব। সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে সর্বোচ্চ ৯০ মিনিট লাগে। সীমিত সম্পদসম্পন্ন পরিবেশেও এই প্রযুক্তি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি, দেশের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

গবেষণাটি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)-এর সহযোগিতায় সম্পন্ন হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্নাল Frontiers in Cellular and Infection Microbiology-এ প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের গবেষণা বৈশ্বিক অঙ্গনে নতুন মর্যাদা অর্জন করেছে।

এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে সরকারি খাদ্য পরীক্ষাগার, ভেটেরিনারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দুধ ও পোল্ট্রি শিল্প এবং মোবাইল আউটব্রেক তদন্ত দল-এর জন্য।

গবেষকরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় দেশব্যাপী বৃহৎ পর্যবেক্ষণ গবেষণা পরিচালনার কথা বলেছেন, যাতে বিভিন্ন জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জাতীয় পর্যায়ে প্রকৃত সংক্রমণের হার নির্ধারণ করা যায়। মাল্টিপ্লেক্স LAMP প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে এক পরীক্ষায় একাধিক টক্সিন জিন শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। প্রজাতি-নির্দিষ্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা তৈরি করে Bacillus cereus এবং কাছাকাছি প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব হবে।

এছাড়া, বহনযোগ্য ফিল্ড কিট তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা খামার, বাজার বা মাঠপর্যায়ে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে এবং দ্রুত ফলাফল পাওয়া যাবে। সর্বশেষ, এই প্রযুক্তিকে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে Bangladesh Food Safety Authority এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার নজরদারি কার্যক্রম আরো কার্যকর হবে।

তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, সীমিত বাজেটের কারণে গবেষণাটি বিস্তৃত করা সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া গেলে আরো অনেক ধরনের খাবার ও বিভিন্ন এলাকায় এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকে আরো শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন