জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের মাস্টার্স প্রফেশনাল প্রোগ্রামের নীতিমালা সংশোধনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি নিয়ম হঠাৎ পরিবর্তন করে সহযোগী অধ্যাপকদের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হওয়ার সুযোগ বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষকদের একটি বড় অংশ। অভিযোগ উঠেছে, কিছু প্রভাবশালী অধ্যাপক ক্ষমতা ও আর্থিক সুবিধা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেই পরিকল্পিতভাবে এই নীতিমালা পরিবর্তন করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের মাস্টার্স প্রফেশনাল প্রোগ্রামের নীতিমালা অনুযায়ী এতদিন বিভাগে প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক—উভয় পদমর্যাদার শিক্ষকই যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতেন। এই নীতিমালা অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকরা দক্ষতার সঙ্গে প্রোগ্রাম ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা ছিল, অন্যদিকে শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের ভারসাম্যও বজায় থাকত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওই নীতিমালায় পরিবর্তন এনে সহযোগী অধ্যাপকদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষকদের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত এই নীতিমালা ইতোমধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত হয়েছে এবং বর্তমানে সিন্ডিকেটের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই অনুষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
শিক্ষকদের একটি অংশের অভিযোগ, এই নীতিমালা সংশোধনের পেছনে শিক্ষার মান উন্নয়ন বা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই। বরং এর মাধ্যমে কিছু অধ্যাপক ক্ষমতা ও আর্থিক সুবিধা নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করার পথ সুগম করছেন। মাস্টার্স প্রফেশনাল প্রোগ্রাম পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সম্মানী, সুযোগ-সুবিধা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রোগ্রাম ডিরেক্টরের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। সহযোগী অধ্যাপকদের এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে সেই ক্ষমতা সীমিত একটি গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সহযোগী অধ্যাপকরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অধ্যাপক পর্যায়ের শিক্ষকদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অথচ শুধুমাত্র পদমর্যাদার অজুহাতে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যা এক ধরনের বৈষম্য এবং পেশাগত অবমূল্যায়নের শামিল।
আরো অভিযোগ উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অনুষদের মাস্টার্স প্রফেশনাল প্রোগ্রামের নীতিমালায় এখনো সহযোগী অধ্যাপকদের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ বহাল রয়েছে। অর্থাৎ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই একই ধরনের প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে নীতিগত অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, শুধু লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদেই সহযোগী অধ্যাপকদের পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে কি না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে শিক্ষক সমাজের মধ্যে বিভাজন আরো বাড়াবে। সহযোগী অধ্যাপকরা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করলে তা শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে একচেটিয়াকরণ তৈরি হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিন্ডিকেটে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। নীতিমালাটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক—উভয়ের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হলে সংকট অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে। তারা আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একক সিদ্ধান্ত বা গোষ্ঠীস্বার্থের ভিত্তিতে নীতিমালা পরিবর্তন হলে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও একাডেমিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের মাস্টার্স প্রফেশনাল প্রোগ্রামের নীতিমালা সংশোধন নিয়ে উদ্ভূত বিতর্কের সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধান এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মল্লিক আকরাম হোসেন বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও কাজ চলছে। এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদন হলেও আরো কাজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই সবার সঙ্গে আলোচনা করছি বিষয়টি নিয়ে। এটি সবার সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা হবে। যেহেতু এখানে অনেক বিভাগের বিষয় জড়িত, তাই কাউকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে না।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চায় প্রফেশনাল প্রোগ্রাম নিয়ে সব অনুষদের জন্য একটি ইউনিফায়েড নীতিমালা থাকুক। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট কমিটি কাজ করছে। তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে। আমরা সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেব। আমি এখনো কোনো মতামত দিইনি। কারও কোনো প্রশ্ন বা সংশয় থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উত্থাপন করা যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে এখনও কাজ চলছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


মাধ্যমিকের পাঠ্যবই মুদ্রণ এখনো বাকি, এনসিটিবির লক্ষ্যমাত্রা ২২ জানুয়ারি