ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ৯ সিনেমার হিসাব-নিকাশ

বিনোদন রিপোর্টার

ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ৯ সিনেমার হিসাব-নিকাশ

ঈদুল আজহায় দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ৯টি সিনেমা। দীর্ঘদিন পর প্রেক্ষাগৃহে দেখা গেছে ব্যতিক্রমী এক প্রতিযোগিতা। এবারের ঈদে মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিন মিলিয়ে একসঙ্গে মুক্তি পেয়েছে নয়টি নতুন সিনেমা। সিনেমাগুলো হলো—‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’, ‘মাসুদ রানা’, ‘বনলতা সেন’, ‘অফিসার’, ‘তছনছ’, ‘পিনিক’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’।

উৎসবের এ মৌসুমে বন্ধ থাকা কিছু প্রেক্ষাগৃহ সাময়িকভাবে চালু হওয়ায় দেশের প্রদর্শনযোগ্য হলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭০-১৮০টির মতো। তবে একসঙ্গে এতগুলো সিনেমা মুক্তি পেলেও রুপালি জগতের এ বড় আয়োজন বক্স অফিসে পুরোপুরি জমে ওঠেনি। সীমিত প্রেক্ষাগৃহ ও দর্শকের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কারণে ঈদের সিনেমা ব্যবসা সামগ্রিকভাবে ‘মন্দের ভালো’ বলে মন্তব্য করেছেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা। তবে নয়টি সিনেমা মুক্তি পেলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত চারটি সিনেমা—‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’ ও ‘বনলতা সেন’। বাকি সিনেমাগুলো দর্শক টানতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বরাবরের মতোই ঈদের বাজারে হল সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন ঢালিপাড়ার শীর্ষ নায়ক শাকিব খান। আজমান রুশো পরিচালিত তার মিউজিক্যাল ফিল্ম ‘রকস্টার’ সর্বোচ্চ ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পেয়ে বক্স অফিসে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। অ্যাকশন ঘরানার বাইরে গিয়ে একজন রকস্টারের জীবনযুদ্ধ ও তার উত্থান-পতনের গল্পে শাকিব খানের নতুন ‘রক লুক’ এবং স্টাইলিশ পারফরম্যান্স ভক্তদের মাঝে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি করেছে। সিনেমায় শাকিবের বিপরীতে অভিনয় করেছেন সাবিলা নূর ও তানজিয়া জামান মিথিলা, আর একটি বিশেষ চরিত্রে দেখা গেছে ভারতের কণ্ঠশিল্পী সুনিধি নায়েককে। ‘তাণ্ডব’ সিনেমার পর এটি শাকিব-সাবিলা জুটির দ্বিতীয় কাজ। মুক্তির পর স্টার সিনেপ্লেক্সে সিনেমাটির শো সংখ্যা ১৮ থেকে বেড়ে ৩৫-এর বেশিতে গিয়ে ঠেকেছে। তবে শাকিবের অভিনয়ের প্রশংসা মিললেও সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য ও অতিরিক্ত মাদকাসক্তির দৃশ্য নিয়ে কিছু দর্শক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনেকে সিনেমাটিকে বড় পর্দার চেয়ে টেলিফিল্মের মতো বলেও মন্তব্য করেছেন। অবশ্য পরিচালক আজমান রুশো এ সমালোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং একে একটি সফল পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন।

ঈদের সবচেয়ে আলোচিত ও শিল্পমানসম্পন্ন সিনেমার তালিকায় রয়েছে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ এবং মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘বনলতা সেন’। কবি জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী কবিতা অবলম্বনে সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘বনলতা সেন’ সিনেমার নির্মাণশৈলী, সিনেমাটোগ্রাফি এবং বাপ্পা মজুমদারের সুর-সংগীত দর্শককে মুগ্ধ করেছে। সিনেমায় নামভূমিকায় মাসুমা রহমান নাবিলা এবং কবির চরিত্রে খায়রুল বাসারের রসায়ন সমাদৃত হলেও সাধারণ দর্শকের একটি অংশের কাছে এর গতি কিছুটা ধীর ও জটিল মনে হয়েছে।

অন্যদিকে শুধু মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক মুক্তি পাওয়া ‘রইদ’ চলচ্চিত্র মহল ও দর্শকের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আদম ও হাওয়ার আদিম আখ্যানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এ মেটাফোরিক্যাল রহস্যধর্মী ড্রামায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি। সিনেমায় দেখা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধু নামের এক যুবক তার মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রীকে দূরে ফেলে আসার চেষ্টা করলেই বাড়ির পাশের তালগাছ থেকে তাল ঝরে পড়ে এবং স্ত্রী আবার ফেরার পথ খুঁজে পায়। সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল ও অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হলেও প্রতীকী উপস্থাপনার কারণে সাধারণ অনেক দর্শকের কাছে গল্পটি বেশ জটিল লেগেছে। অনেকেই বলছেন, সিনেমাটি তাদের ‘মাথার ওপর দিয়ে গেছে’।

দীর্ঘদিন পর পর্দায় জুটি বেঁধে ‘মালিক’ সিনেমার মাধ্যমে ফিরেছেন আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিম। সাইফ চন্দন পরিচালিত সিনেমাটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২টি হল পেয়েছিল এবং শুরুর দিকে কিছু শো হাউসফুলও যায়। অপরাধ জগতের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠা এক জেদি যুবকের প্রতিশোধের গল্পে শুভকে পুরোদস্তুর অ্যাকশন হিরো লুকে দেখে ভক্তরা উচ্ছ্বসিত হলেও দুর্বল গল্প ও চিত্রনাট্যের কারণে সিনেমাটি দর্শককে পুরোপুরি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

একইভাবে কাজী আনোয়ার হোসেনের জনপ্রিয় স্পাই থ্রিলার অবলম্বনে সৈকত নাসির নির্মিত ‘মাসুদ রানা’ সিনেমাটি নিয়ে দর্শককে দারুণ কৌতূহল ছিল। রাসেল রানা ও পূজা চেরী অভিনীত সিনেমাটি মুক্তির পর পর কয়েকটি শো হাউসফুল গেলেও দুর্বল ভিএফএক্স, এআই প্রযুক্তির দুর্বল ব্যবহার এবং গল্পের অসামঞ্জস্যের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।

আদর আজাদ ও শবনম বুবলী অভিনীত মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘পিনিক’ মুক্তির আগে আলোচনায় থাকলেও প্রেক্ষাগৃহে এসে দর্শককে হতাশ করেছে। সিনেমার প্রচারে প্রধান তারকাদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রযোজকের মাঝে অসন্তোষও দেখা গেছে। এছাড়া বদিউল আলম খোকনের ‘তছনছ’, ডিএ তায়েবের ‘অফিসার’ এবং আকাশ হকের ‘ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ সিনেমাগুলো নামমাত্র মুক্তি পেলেও চরম দর্শক সংকটে পড়েছে। দেশের বক্স অফিসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও আশার আলো দেখাচ্ছে বিদেশের বাজার। প্রবাসীদের মাঝে ঈদের আমেজ ছড়িয়ে দিতে এরই মধ্যে দেশের বাইরে মুক্তি পেয়েছে ‘রকস্টার’ ও ‘রইদ’।

আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের মোট ৪১টি প্রেক্ষাগৃহে স্বপ্ন স্কেয়ারক্রোর পরিবেশনায় প্রদর্শিত হচ্ছে শাকিব খানের ‘রকস্টার’। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নসহ প্রধান শহরগুলোয় মুক্তি পেয়েছে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’।

এছাড়া আগামী সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংকসটাউনে বঙ্গজ ফিল্মসের পরিবেশনায় মুক্তি পেতে যাচ্ছে আরিফিন শুভর ‘মালিক’। বিশেষ এ প্রদর্শনীতে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন নায়ক আরিফিন শুভ নিজে, যা নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে অগ্রিম টিকিট বিক্রির ধুম পড়েছে। সব মিলিয়ে এবারের ঈদুল আজহার সিনেমাগুলো যেমন নির্মাণ ও গল্পের দিক থেকে নতুন ধারার ইঙ্গিত দিয়েছে, তেমনি হলের সীমাবদ্ধতা ও দর্শকের মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলচ্চিত্র পাড়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন