টিভি চ্যানেলে উপেক্ষিত শিশু বিনোদন

এমরানা আহমেদ

টিভি চ্যানেলে উপেক্ষিত শিশু বিনোদন

দেশে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। চ্যানেলের সংখ্যা এত যে, সবগুলোর নামও অনেকের জানা নেই। এর মধ্যে বেশির ভাগ চ্যানেলই সংবাদনির্ভর এবং কিছু বিনোদনের। কিন্তু শিশুদের মানসিক বিকাশে চ্যানেলগুলোয় বিশেষ কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।

বর্তমানে বড়রা যেমন তথ্যের জন্য, বিনোদনের জন্য, টেলিভিশন-ইন্টারনেটের ওপর দৃষ্টি রাখছেন, ঠিক তেমনি দৃষ্টি রাখছে ছোটরাও। অনেক সময় শিশুরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে তথ্য জানার চেয়ে রেডিও, টিভি ও ইন্টারনেটের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চ্যানেলের বিনোদন ও সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠানমালায় শিশু উপেক্ষিত।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে শিশুর হাতে একটা মোবাইল ফোন দেখলেই বাবা-মা মনে করেন যে শিশু খারাপ হয়ে যাচ্ছে, শিশু প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। এগুলোর কারণ হলো— এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে শিশুদের গুরুত্ব কম, শিশুরা পিছিয়ে। যেসব টিভি শো, গেম, অ্যাপ ইত্যাদি গড়ে উঠছে—এর বেশির ভাগই বড়দের জন্য, শিশুরা এগুলো দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০টির বেশি অনুমোদিত টিভি চ্যানেল রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০-৪২টি পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচারে আছে (রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি মিলিয়ে) এবং বাকিগুলো সম্প্রচার শুরুর অপেক্ষায় আছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিটিভি এবং বেসরকারি চ্যানেল এটিএন বাংলা, এনটিভি, আরটিভি, যমুনা টিভি, একুশে টিভি, চ্যানেল আই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলায় ২০০৩ সাল থেকে শিশুদের জন্য ‘আমরা করব জয়’ নামে সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান প্রতি শনিবার বিকাল ৫টায় প্রচারিত হয়। যেখানে শিশুরাই তাদের নিজেদের সমস্যা এবং প্রতিকার নিয়ে সংবাদ বানিয়ে তা প্রচার করে। এছাড়া একই চ্যানেলে ‘শাপলা শালুক’ নামে শিশুদের অংশগ্রহণে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও প্রচারিত হয়। চ্যানেল সূত্রে জানা যায়, ছবি আঁকা, কাগজ দিয়ে ক্রিয়েটিভ অনেক কিছু বানানো শিখানোর জন্য ‘আর্টেন ক্রাফট’ নামে শিশুদের একটি অনুষ্ঠান ছিল। কিন্তু বাজেট স্বল্পতার কারণে বেশ কিছুদিন প্রচারিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। শিশুদের অনুষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন এবং স্পন্সর পাওয়া যায় না বলে শিশুদের জন্য চ্যানেল মালিকরা অনুষ্ঠান বানাতে আগ্রহ দেখায় না।

‘দুরন্ত’ নামের একটি বেসরকারি চ্যানেল শুধু শিশুর মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য ২৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে।

এনটিভিতে সপ্তাহে একদিন শিশুদের জন্য বিজ্ঞানবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘বিজ্ঞানে আনন্দ’ নামে একটি অনুষ্ঠান আছে। যা প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় প্রচারিত হয়। এছাড়া রয়েছে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য স্কুলভিত্তিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ‘টিফিনের ফাঁকে’। প্রচারিত হয় শনিবার সন্ধ্যায়।

একুশে টেলিভিশনে শিশুদের জন্য ‘মুক্ত খবর’ নামে একটি সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান ১৭ বছর বন্ধ থাকার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আবার পুনরায় শুরু হয়েছে। টেলিভিশনের শিশু প্রোগ্রাম বাড়ানো গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে বেসরকারি জনপ্রিয় চ্যানেল এনটিভির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার কাজী মুহাম্মদ মোস্তফা আমার দেশকে বলেন, টিভি চ্যানেলগুলোতে শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক ও মানসম্মত প্রোগ্রাম বাড়ানো জরুরি। কারণ এটি ভাষা, জ্ঞান, সামাজিক-আবেগিক বিকাশ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, তবে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও মনোযোগের সমস্যা বাড়াতে পারে, তাই শিশুদের জন্য ভালো মানের প্রোগ্রাম বৃদ্ধি ও একই সঙ্গে স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীদের উদ্দেশে বলেন, শিশুদের বিকশিত হওয়ার জন্য কিছু পথ খুলে দিন। যার মাধ্যমে তারা দেশের ভবিষ্যতে পরিণত হতে পারবে। আর না হলে তাদের মনে সব সময় একটা প্রশ্নই থেকে যাবে। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে শিশুদের আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব, শিশুদের নিজ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানানো সম্ভব, শিশুদের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কেননা শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। যখন একটি শিশু দেখে যে টিভির ভেতরের কার্টুনটা বাবা-মার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে, তখন তার মধ্যেও বাবা-মার সঙ্গে এরকম আচরণ করার একটা আগ্রহ কাজ করে। এছাড়া এর মাধ্যমে শিশুদের স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব। যেহেতু, আপনারা জানেন যে শিশুরা টিভি-চ্যানেলসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে কেন চেষ্টা করেন না এর মাধ্যমেই শিশুকে ভালো কিছু শেখাতে? কেন চেষ্টা করেন না এর মাধ্যমেই শিশুকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।

এটিএন বাংলার আমরা করব জয়ের দায়িত্বে থাকা চিফ রিপোর্টার তনিমা আখতার আমার দেশকে বলেন, এখন শিশুদের অবসর কাটে নানা ধরনের বিদেশি কার্টুন ও ভিডিও গেম খেলে। তাদের আচার-আচরণে ওসব মিডিয়ার প্রভাব পড়ে। এছাড়া গেমসের সহিংস দৃশ্য দেখার মধ্যদিয়ে শিশুদের মধ্যে এক ধরনের আক্রমণাত্মক ভাব কাজ করে এসব কারণে দেশপ্রেম, সততা নষ্ট হয়। এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত টক-শো হচ্ছে, বিভিন্ন প্রোগ্রাম হচ্ছে এবং যতক্ষণ এসব টক-শো, প্রোগ্রাম হচ্ছে ততক্ষণ বড়দের মনে শিশুদের জন্য একধরনের সহমর্মিতা কাজ করে। কিন্তু তারপর? অনুষ্ঠান শেষে সবাই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। তাহলে কী আমি একজন শিশু হয়ে বড়দের কাছে প্রশ্ন করতে পারি যে আমাদের নিয়ে কি আপনারা আসলেই ভাবেন? নাকি তা নামে মাত্র? প্রত্যেক সচেতন মানুষ বলে থাকেন যে, ‘শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। কিন্তু যদি তাই হয়ে থাকে তবে গণমাধ্যমে শিশুদের আলাদা গুরুত্ব নেই কেন?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন