একদিন স্কুলে পড়ানোর সময় এক শিক্ষক তার ছাত্রদের একটি মানচিত্র দেখাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘এই যে জায়গাটা দেখতে পাচ্ছ, এটা হলো ইউরোপ মহাদেশ।’ সবাই শিক্ষকের দেখানো মানচিত্রটির দিকে চুপ করে তাকিয়ে আছে। সে সময় এক কোণে বসে থাকা এক ছোট ছেলে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তার চোখে আলোর ঝিলিক। সে আঙুল দিয়ে মানচিত্রে থাকা একটি দ্বীপ দেখিয়ে বলল, ‘এটা কর্সিকা, স্যার। কর্সিকা আমার জন্মভূমি। একদিন আমি এই দ্বীপটিকে গর্বিত করব।’
ছেলেটির কথা শুনে সহপাঠীরা হেসে উঠল। একজন জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি পারবে নাকি?’
ছেলেটি শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‘আমি পারব, অবশ্যই পারব। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আমি তা পারব।’
এমন আত্মবিশ্বাসে ভরা জবাব দিয়েছিল যে ছেলেটি, সেই ছোট ছেলেটির নাম ছিল নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte)।
নেপোলিয়নের জন্ম ১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট, ভূমধ্যসাগরের ছোট দ্বীপ কর্সিকায়। তার পরিবার ছিল গরিব, কিন্তু সম্ভ্রান্ত। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন চুপচাপ, ভাবুক আর নিজের জগতে ডুবে থাকা এক ছেলে। সহপাঠীরা তাকে নিয়ে মজা করত, কারণ তার ফরাসি উচ্চারণ ছিল এদের চেয়ে ভিন্ন। তিনি পড়তেন ইতিহাস, বিশেষ করে যোদ্ধাদের কাহিনি। তিনি বলতেন, ‘আমি একদিন এমন কিছু করব, যা কেউ ভুলতে পারবে না।’
ছোটবেলাতেই নেপোলিয়ন দেখেছিলেন ক্ষমতাবানদের অন্যায়-অত্যাচার ও গরিবদের লাঞ্ছিত কঠিন জীবন। তাই তার মন গড়ে ওঠে দৃঢ়তা ও সাহসিকতা নিয়ে। তিনি স্কুলে খুব বুদ্ধিমান ছিলেন, বিশেষ করে গণিত ও যুদ্ধকৌশলে। শিক্ষকরা বলতেন, ‘এই ছেলেটির মাথায় সৈন্যদলের মতো শৃঙ্খলা রয়েছে।’
বড় হয়ে নেপোলিয়ন যোগ দেন ফরাসি সেনাবাহিনীতে। সেখানে তার মেধা ও সাহস দ্রুতই সবার নজর কাড়ে। খুব অল্প বয়সেই তিনি জেনারেল হন। তার নেতৃত্বে ফরাসি সেনারা একের পর এক যুদ্ধ জিতে যায়।
যুদ্ধের ময়দানে তিনি ছিলেন দুঃসাহসী ও বিচক্ষণ। কখনো শত্রুর চেয়ে বেশি সৈন্য না থাকা সত্ত্বেও তিনি জয় ছিনিয়ে আনতেন। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল—‘অসম্ভব শব্দটি শুধু দুর্বলদের অভিধানে থাকে।’
১৭৯৯ সালের ৯ নভেম্বর নেপোলিয়ন ফ্রান্সের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পরে ১৮০৪ সালের ১৮ মে তিনি সম্রাট হন। তখন ফ্রান্স নানা বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত ছিল। নেপোলিয়ন সেই অরাজক দেশে শৃঙ্খলা এনে দেন। নতুন আইন, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা ও শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে তোলেন। তার তৈরি করা ‘নেপোলিয়নিক কোড’ বা নাগরিক আইন আজও বহু দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে তার জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি ছিল ভুল ও পতন। ইউরোপ জয় করতে গিয়ে তিনি অতিরিক্ত যুদ্ধ করেন। অনেক দেশে সেনা পাঠান, অনেক যুদ্ধ জেতেন, আবার অনেক যুদ্ধে হেরে যান। শেষ পর্যন্ত তিনি বন্দি হন এবং এক ছোট দ্বীপ সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিত হন।
সেখানে বসে একদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার তরবারি দিয়ে দেশ জয় করেছি, কিন্তু স্থায়ী জয় সম্ভব শুধু হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে।’ এই কথায় বোঝা যায়, বয়সের শেষে তিনি বুঝেছিলেন মানবতা সব জয়ের চেয়ে বড়।
নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ১৮২১ সালের ৫ মে নেপোলিয়ন মারা যান, কিন্তু তার নাম অমর হয়ে থাকে। আজও তাকে এক সাহসী নেতা এবং এক অদম্য মনোবলের মানুষ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
ছোটবেলার সেই মানচিত্রে আঙুল রাখা ছেলেটি সত্যিই তার কথার মান রেখেছিলেন। কর্সিকার সেই দরিদ্র পরিবারের সন্তান একদিন ইউরোপের সর্বশক্তিমান শাসক হয়ে উঠেছিলেন।
নেপোলিয়নের জীবন আমাদের শেখায় দারিদ্র্য বা কষ্ট কারো ভাগ্য নির্ধারণ করে না। নিজের স্বপ্ন, পরিশ্রম ও বিশ্বাসই মানুষকে মহৎ করে তোলে। তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন মানুষ যদি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখে, তবে ছোট দ্বীপ থেকেও তিনি পৃথিবী জয় করতে পারেন। তার জীবনের গল্প সাহস, অধ্যবসায় আর আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
আজকের শিশুদের জন্য নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এক অনুপ্রেরণা। তিনি শেখান, কেউ তোমার ওপর বিশ্বাস না রাখলেও তুমি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখো। কারণ প্রতিটি মানুষের মধ্যেই এক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।
বরণীয় মানুষ নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। তার স্মরণীয় ঘটনা সেই ছোটবেলার স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাস, যা তাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করেছে। এ লেখাটির শেষপ্রান্তে এসে তোমাদের কাছে আরেকটি কথা বলি—নেপোলিয়ন খুব মা-ভক্ত সন্তান ছিলেন। ফ্রান্সের মতো বিশাল দেশের সম্রাট হয়েও তিনি নিয়মিত মায়ের খোঁজখবর নিতেন, মায়ের কথা মেনে চলতেন। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

