আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আবু বকর (রা.)-এর শাসনকালে খিলাফত রাষ্ট্রের ব্যয়ের খাতসমূহ

আবদুর রহমান মুহাম্মাদ নওয়াব

আবু বকর (রা.)-এর শাসনকালে খিলাফত রাষ্ট্রের ব্যয়ের খাতসমূহ

আগের পর্বে বর্ণিত আয়ের উৎসগুলো থেকে সম্পদ বাইতুল মালে জমা হতো। খলিফা আবু বকর (রা.) খিলাফত রাষ্ট্র ও নাগরিকদের কল্যাণে তা ব্যয় করতেন।

বিজ্ঞাপন

এক. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিশ্রুত সম্পদ প্রদান

আল্লাহর রাসুল (সা.) তার জীবদ্দশায় জাবির (রা.)-সহ বহু সাহাবিকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাসুল (সা.)-এর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু বকর (রা.) প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে তাদের সবাইকে ডেকে আনেন এবং বাইতুল মাল থেকে নবীজি কর্তৃক প্রদত্ত সেই প্রতিশ্রুত সম্পদ প্রত্যেককে যথাযথভাবে দেন।

দুই. খলিফা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভাতা

খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বাইতুল মাল থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন না। নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি আগের মতোই শ্রম ব্যয় করে উপার্জন করতেন। খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পরও তাকে দেখা যেত—কাঁধে কাপড়ের বোঝা নিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে যাচ্ছেন। একদিন বিষয়টি উমর ইবনুল খাত্তাব ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর দৃষ্টিগোচর হয়। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে মুসলিমজাহানের খলিফা! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’

তিনি উত্তরে বললেন, ‘বাজারে যাচ্ছি কাপড় বিক্রি করতে।’ তারা বললেন, ‘আপনার কাঁধে তো সমগ্র মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এমন অবস্থায় এখনো কি আপনি বাজারে যাবেন?’ আবু বকর (রা.) বললেন, ‘তাহলে আমি ও আমার পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হবে কীভাবে?’

তারা তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আপনার আর বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি ফিরে আসুন। আপনার জন্য বাইতুল মাল থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করা হবে।’ এরপর দায়িত্বশীল সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আবু বকর (রা.) ও তার পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য বাইতুল মাল থেকে স্বল্প পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করা হয়। এ ভাতার পরিমাণ ছিল বার্ষিক মাত্র ছয় হাজার দিরহাম। পাশাপাশি বাইতুল মালের অর্থ থেকে তার হজ ও উমরায় গমনের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনের ব্যবস্থাও করা হয়।

খিলাফত রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বাইতুল মাল থেকে ভাতা দেওয়া হতো। জাকাত উত্তোলন ও সংগ্রহের দায়িত্বশীলকে সাধারণত জাকাতের সম্পদ থেকেই ভাতা দেওয়া হতো। আর অন্যান্য প্রশাসক বা কর্মকর্তাদের জাকাতের বাইরে বাইতুল মালের অন্যান্য খাত থেকে ভাতা দেওয়া হতো। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর যুগে ভাতা নির্ধারিত ছিল না। তখন সাধারণত গনিমত থেকে মুসলিমরা ভাতা নিতেন। এছাড়া খিরাজি জমি থেকে আগত সম্পদ থেকেও তাদের ভাতা দেওয়া হতো।

আবু বকর (রা.) খলিফা হওয়ার পর সবার সরকারি ভাতা সমান করে দেন। তিনি বলেন, ‘এটি হলো জীবিকা। এ ক্ষেত্রে কমবেশি করার চেয়ে সমান দেওয়াই উত্তম।’ (তারিখুল ইসলাম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৮৭) তখন ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তী বিবেচনায় ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করা হতো।

তিন. সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়

খলিফা আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বাইতুল মালের সম্পদ থেকে উট, ঘোড়া ও বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ার কিনতেন এবং সেগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের কাজে ব্যবহারের জন্য মুজাহিদদের কাছে সরবরাহ করতেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি খিলাফত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সামরিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে বাইতুল মালের অর্থ ব্যয় করাকে সম্পূর্ণ বৈধ ও অপরিহার্য মনে করতেন। ইবনু সাদ রচিত আত তাবাকাতুল কুবরা গ্রন্থে এ বিষয়ে বর্ণনা পাওয়া যায়। (খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২১৩)

চার. অমুসলিম বন্দিদের পেছনে ব্যয়

বাইতুল মালের অর্থ থেকে অমুসলিম বন্দিদের ভরণপোষণের দায়িত্বও গ্রহণ করা হতো। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পানাহার, পোশাক ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থা করা হতো, যাতে বন্দিত্বের সময় তারা মানবিক মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে। শুধু জীবিত অবস্থাতেই নয়, কোনো অমুসলিম বন্দি মৃত্যুবরণ করলে তার দাফন বা সৎকারের প্রয়োজনীয় খরচও রাষ্ট্রীয় কোষাগার—বাইতুল মাল বহন করত। (আল আহকামুস সুলতানিয়া, মাওয়ারদি, পৃষ্ঠা : ১৯৪-১৯৬)

পাঁচ. জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম

খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নানা জনহিতকর ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়মিতভাবে বাইতুল মালের অর্থ ব্যয় করা হতো। জনসাধারণের সুবিধা ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কূপ খনন, ফসলি জমিতে সেচের ব্যবস্থা, শীতবস্ত্র বিতরণ, পথঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সম্পদ ব্যবহার করা হতো। এক বছর খলিফা আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বাদিয়া অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ বস্ত্র কিনে তা বাইতুল মালে সংরক্ষণ করেন। পরে শীতকাল এলে তিনি এসব বস্ত্র মদিনার দরিদ্র ও বিধবা নারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। (আত তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২১৩।)

ছয়. জয়গির প্রদান

সাধারণত কোনো গুরুত্বপূর্ণ সেবা বা প্রশংসনীয় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে স্থাবর সম্পত্তি প্রদান করা হতো, যা জয়গির (ইকতা) নামে পরিচিত। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় জয়গির প্রদান ছিল একটি সুসংগঠিত ও নীতিনির্ভর ব্যবস্থা। প্রখ্যাত ফকিহ ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ইমাম মাওয়ারদি উল্লেখ করেন, ইকতা বা জয়গির প্রদান মূলত দুই ধরনের ছিল। প্রথমটি হলো—এমন জমি প্রদান, যা গ্রহীতা শুধু ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারত; অর্থাৎ জমির মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকত আর গ্রহীতা শুধু তার ফলভোগের অধিকার পেত। দ্বিতীয়টি হলো—গ্রহীতাকে জমির মালিকানা দেওয়া হতো। এটিও আবার দুই ভাগে বিভক্ত ছিল—এক. গ্রহীতার জীবদ্দশা পর্যন্ত মালিকানা প্রদান এবং দুই. স্থায়ী বা পূর্ণ মালিকানা প্রদান। (আল আহকামুস সুলতানিয়া : ১৮১; তারিখুল ইসলাম : ৩৮০)

এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে জয়গির হিসেবে প্রদত্ত জমি থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা রাজস্ব বাইতুল মালে দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হতো।

সাত. নবী পরিবার, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য ব্যয়

বাইতুল মাল থেকে নবী পরিবার, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের সম্পদ দেওয়া হতো। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ জনপদ্বাসীদের কাছ থেকে তার রাসুলকে ফায় (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হিসেবে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসুলের, আত্মীয়স্বজনের, এতিমদের, মিসকিন ও মুসাফিরদের। (সুরা হাশর, আয়াত : ৭) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ প্রথমে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হতো। সেখান থেকে যে ভাগটি বাইতুল মালে জমা হতো, সেখান থেকেই কোরআনে বর্ণিত খাতগুলোয় খরচ করা হতো।

আট. জাকাতের খাত

জাকাত বণ্টনের জন্য আল্লাহতায়ালা যেসব খাত উল্লেখ করে দিয়েছেন, উত্তোলিত জাকাত সেসব খাতে ব্যয় করা হতো। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় সদকা (জাকাত) হচ্ছে ফকির ও মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয়, তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাসমুক্ত করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)

বাইতুল মালের সম্পদ বণ্টনে সমতা

বাইতুল মালের সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) স্বাধীন ও দাস, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড়—সবার মধ্যে সম্পূর্ণ ন্যায় ও সমতা বজায় রাখতেন। (আত তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২১৩)

খলিফার আর্থিক হকগুলো বাইতুল মালে প্রদান

মৃত্যু ঘনিয়ে আসা উপলব্ধি করতে পেরে খলিফা আবু বকর (রা.) বলেছিলেন, ‘আমার কাছে বাইতুল মালের যেসব সম্পদ আছে, সব বাইতুল মালে ফেরত দেওয়া হোক। কোনো সম্পদ যেন আমার কাছ থেকে না যায়। আমার অমুক ও অমুক স্থানের জমিগুলো মুসলিমদের কাছে হস্তান্তর করা হোক, কারণ আমি খিলাফতের দায়িত্ব পালনের সময় বাইতুল মাল থেকে ভাতা গ্রহণ করেছি।’ (আত তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৮৬)

খলিফা আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর, দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.) বাইতুল মালে মাত্র এক দিনার অবশিষ্ট পেয়েছিলেন। আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) এর কাছে হিসাব চাওয়া হলে তিনি জানান, বাইতুল মালে মোট প্রায় ২ লাখ দিনারের মতো সম্পদ এসেছিল এবং খলিফা আবু বকর (রা.) এর নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে তা বিতরণ করা হয়েছে।

লেখক : মাস্টার্স, ইসলামি ইতিহাস

উচ্চতর গবেষণা অনুষদ, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিসর

ইমেইল : abdurrahman0177436@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন